বাংলাদেশের যে কোন প্রান্তে নাটোরের মানুষ পরিচিতি পায় বনলতা সেনের দেশের মানুষ হিসেবে। দেশের ভৌগলিক সীমারেখা পেরিয়েও যারা জীবনানন্দকে চেনেন, তারাও নাটোরের মানুষকে চেনেন 'বনলতার নাটোর'র মানুষ হিসেবে। রুপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাস যখন একটি কবিতা লিখলেনই, তখন কেন নাটোরকে নিয়েই লিখলেন অথবা বনলতা সেনকে তো অন্য যে কোন স্থানের হিসেবে লিখতে পারতেন। কিন্ত নাটোরে কেন? এরকম অজস্র প্রশ্নের জন্ম দেয়া জীবনানন্দ দাশ রচনা করেছেন 'বনলতা সেন' কবিতাটি। তাইতো বাংলা সাহিত্যে সর্বাধিক রহস্যময় কবিতা হিসেবে 'বনলতা সেন' এবং বনলতা সেনের বাড়ি হিসেবে সাহিত্যে স্থান পেয়েছে অর্ধবঙ্গেশ্বরী রাণী ভবানী, কাচাগোল্লার শহর ও চলনবিলখ্যাত উত্তরের ছোট্ট জনপদ নাটোর। এরপর থেকে বাংলা সাহিত্যে নাটোর জেলা বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। এই নাটোর নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। যেমন-কবি কি কখনো নাটোরে পদার্পণ করেছিলেন? জীবনানন্দ দাশের অন্য কোনো লেখায় নাটোরের উল্লেখ পাওয়া যায় নি। তাই এই বিষয়টিও অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। স্থানীয়ভাবে গড়ে উঠেছে আরও অনেক কাহিনী। কবি জীবনানন্দ দাশ বাস্তবের কোনো ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করে নাকি কল্পনার কাউকে উদ্দেশ্য করে কবিতাটি লিখেছেন তা এখনও কোনো গবেষক কূলকিনারা করতে পারেন নি। তবে নাটোরের মানুষের কাছে ‘বনলতা সেন’ একজন রক্ত মাংসের মানুষ। নাটোরে স্থানীয়ভাবে ‘বনলতা সেন’ কে নিয়ে বেশকিছু কাহিনী গড়ে উঠেছে। কিন্তু এর বাস্তবিক কোনো ভিত্তি নেই। কেননা ইতিহাসে এসব কাহিনীর কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ
নেই। নাটোরে প্রচলিত একটি কাহিনীতে দেখা যাচ্ছে একসময় ট্রেনে করে দার্জিলিং যেতে হলে নাটোরের উপর দিয়ে যেতে
হতো। একদিন জীবনানন্দ দাশ ট্রেনে করে দার্জিলিং যাচ্ছিলেন। ট্রেনটি যখন নাটোর স্টেশনে পৌঁছায় তখন অপরূপ সুন্দরী একটি মেয়ে ট্রেনে ওঠে। মেয়েটির সাথে ভুবন সেন নামে একজন বৃদ্ধও ছিল। কবি যে কামরায় ছিলেন সেই কামরাতেই তারা উঠেন। কামরায় শুধুমাত্র এই তিনজনই ছিলেন। ভুবন সেন ছিলেন নাটোরের বনেদি সুকুল পরিবারের তারাপদ সুকুলের ম্যানেজার। অপরূপ সুন্দরী সেই মেয়েটি ছিল ভুবন
সেনের বিধবা বোন ‘বনলতা সেন’। একসময় ভুবন সেন ঘুমিয়ে পড়েন। এসময় বনলতা সেনের সাথে কবির আলাপচারিতা জমে ওঠে। এভাবে অনেকটা সময় তারা এভাবেই গল্প করে কাটিয়েছেন। এক সময় ‘বনলতা
সেন’ ট্রেন থেকে নেমে যায়। কবি আবার একা হয়ে যান। ‘বনলতা সেন’ কবিতার একটি লাইন এখানে বিশেষভাবে ফুটে ওঠে। তা হলো - ‘থাকে শুধু অন্ধকার মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন’। দ্বিতীয় যে কাহিনীটি রয়েছে সেটিতেও ভুবন সেনের কথা বলা
হয়েছে। এখানে ‘বনলতা সেন’ ভুবন সেনের বিধবা বোন ও ঘটনাস্থল ট্রেনের বদলে ভুবন সেনের বাড়ির কথা বলা হয়েছে এবং নাটোরের বনেদি পরিবার সুকুল বাবুর কথাও বলা হয়েছে। কবি একদিন নাটোর বেড়াতে যান। নাটোর গিয়ে তিনি সুকুল বাবুর বাড়িতে ওঠেন। একদিন দুপুরে ভুবন সেন কবিকে তার বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেন। কবিকে
আপ্যায়ন করার দায়িত্ব দেয়া হয় ভুবন সেনের বিধবা বোন ‘বনলতা সেন’ কে।
তৃতীয় কাহিনীর কেন্দ্রেও আছেন ভুবন সেনের বিধবা বোন বনলতা। তবে ঘটনাস্থল এবার ট্রেন নয়, ভুবন সেনের বাড়ি। নাটোরে বেড়াতে গেছেন জীবনানন্দ। অতিথি
হয়েছেন নাটোরের বনেদি পরিবার সুকুলবাবুর বাড়িতে। এক দুপুরে সুুকুল
এস্টেটের ম্যানেজার ভুবন সেনের বাড়িতে নিমন্ত্রণ। ভুবন সেনের বিধবা বোন বনলতা সেনের ওপর পড়েছে অতিথি আপ্যায়নের
দায়িত্ব। খাবারের বিছানায় বসে আছেন কবি। হঠাৎ অবগুন্ঠিত এক বিধবা বালিকা। শ্বেত শুভ্র বসনের চেয়েও অপরূপ এক সৌন্দর্যমন্ডিত মুখ। চমকে উঠলেন কবি। এত অল্প বয়সে বিধবা বসন কবির মনকে আলোড়িত করে। হয়তো সে সময় দু-একটি কথাও হয় কবির সঙ্গে বনলতার। তারপর একসময় নাটোর ছেড়ে যান কবি। সঙ্গে নিয়ে যান এক অপরূপ মুখের ছবি। সেই ছবিই হয়তো কবিকে পথ দেখিয়েছে অন্ধকারে,
চারদিকে সমুদ্র সফেনের ভেতরও খুঁজে পেয়েছেন শান্তির পরশ। চতুর্থ একটি কাহিনী নাটোরে প্রচলিত রয়েছে। তবে এবার ঘটনাস্থল নাটোরের রাজবাড়ি। কোনো এক সময় নাটোরের কোনো এক রাজার আমন্ত্রণে রাজবাড়িতে বেড়াতে
আসেন কবি জীবনানন্দ দাশ। কবির দেখাশোনা করার জন্য রাজা কয়েকজন সুন্দরীকে দায়িত্ব দেন। এদের মধ্যে একজন সুন্দরীর প্রতি কবির আলাদা মমতা জেগে ওঠে। কবি সেই সুন্দরীকে নিয়ে কবিতা লেখার কথা জানালে সেই সুন্দরী তাতে মত দেয় না। শেষে কবির পীড়াপীড়িতে কবিকে অন্য কোনো নামে কবিতা লেখার অনুরোধ করেন। তাই তো সেই সুন্দরীর প্রকৃত নাম লুকিয়ে ‘বনলতা সেন’ নামটি উল্লেখ করেন। ড. আকবর আলী খান তার 'পরার্থপরতার অর্থনীতি' বইয়ে বনলতা সেনের 'সেন' উপাধি আর তার বাসস্থান নাটোর এই দুইয়ের সংযোগে আরেকটি ব্যাখ্যা হাজির করেছেন। আকবর আলী খানের মতে 'নাটোর' শব্দটির ব্যবহার শুধু বনলতা সেনের ঠিকানা নির্দিষ্ট করতে নয়, তার পেশা নির্দিষ্ট করতেও। দলিল দস্তাবেজ ঘেঁটে দেখা যায় এ শতাব্দীর প্রথমদিকে নাটোর কাঁচাগোল্লার জন্য নয়, বিখ্যাত ছিলো রূপোপজীবিনীদের ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে। 'সেন' শব্দটি তার বংশের পরিচয় বহন করছে, পেশা গ্রহণ করবার পর 'বনলতা' নামের আড়ালে সে তার নিজের আসল নাম গোপন করেছে।
গল্প-কাহিনী যত যাই থাক কোনোটিরই বাস্তবিক কোনো ভিত্তি ও ইতিহাস সূত্র বহন করে না। বাঘা বাঘা সব গবেষকরাও বছরের পর বছর গবেষণা করে এই ‘বনলতা সেন’ রহস্য উদঘাটন করতে পারেন নি। বিশ্বের
আর দশটা রহস্যের মতো এটিও একটি
অজানা রহস্য হিসেবেই রয়ে গেছে।
বনলতা সেন কবিতাটি পড়ে কোটি তরুণ হূদয় এখনও আপ্লুত হয়। ক্লান্তির ছায়া নামে প্রাণের গভীরে। রাত্রির অন্ধকারে মন চায় মুখোমুখি বসতে। কবি জীবনানন্দ দাশের জন্ম ১৮৯৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বরিশাল শহরে। যৌবনে কলকাতায় পথ চলা শুরু। বিষাদময় জীবনের ধূসর জগতে কবি হেঁটেছেন হাজার বছর ধরে। সিংহল সমুদ্র থেকে মালয় সাগর ঘুরে অশোকের বিম্বিসার আর বিদর্ভ নগরীর পথে পথে। ক্লান্ত প্রাণ
কবিকে দু'দন্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন। স্ফটিকস্বচ্ছ কপালের নিচে মায়বী চোখ খোঁজে রূপালী চাঁদের আলো। দুলে ওঠে স্বপ্নের শাড়ি আর পৃথিবীটা ভরে ওঠে পরাজিতের কবরে। থাকে শুধু অন্ধকার। প্রায় গতিহীন ট্রামের নিচে পড়ে ১৯৫৪ সালের আজকের এই দিনে জীবনানন্দ দাশের জীবনাবসান হয়, ফুরায় জীবনের সব লেনদেন।
