নাটোর জেলার সাহিত্য নিয়ে বিশেষ আয়োজন
বর্তমানে নাটোর জেলার সাহিত্যচর্চার গতি প্রকৃতি অতীতের মতো চলমান ও বেগবান না হলেও স্থির নয়। বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয়তম আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাশ তার বহুল পঠিত ‘বনলতা সেন’ কবিতায় নাটোরের নাম যুক্ত করে বাংলার সাহিত্যাঙ্গনে এ জেলাটিকে স্থায়ীভাবে সংযুক্তি দিয়েছেন। মোট ৩০টি কবিতার সংকলিতরূপে ‘বনলতা সেন’ নামে কবির একটি কাব্যও রয়েছে (সিগনেট প্রেস, ১৯৫২); বনলতা সেনকে নিয়ে কবি মোট ৬টি কবিতা লিখেছেন। চলনবিলের পাললিক সমতল ভূমিতে শুধু ভালো শস্যকণাই জন্মায় না, এ অঞ্চলে জন্ম নিয়েছেন অনেক ইতিহাসখ্যাত মহান ব্যক্তিত্ব। প্রাচীন পাল ও সেন আমলে এমনকি মোগল আমলেও শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে নাটোরের অবদান অনস্বীকার্য। বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার বাহিনীর সঙ্গে ইংরেজদের পলাশীর প্রান্তরে যুদ্ধের সময় নাটোরের মহারাণীভবানী নবাবের পক্ষে সৈন্য এবং অর্থ সাহায্যও পাঠিয়েছিলেন। প্রমথনাথ বিশী নাটোর শহরের প্রাচীনত্ব ও গৌরব সম্পর্কে মন্তব্য করেন: ‘উত্তরবঙ্গে যাবতীয় শহরের মধ্যে গৌড় বাদে নাটোরই বোধহয় সবচেয়ে প্রাচীন সহর। ...কিন্তু যখন রাজসাহী নামটিও অজ্ঞাত ছিল রামপুর-বোয়ালিয়া [বর্তমান রাজশাহীর পূর্বনাম] একটি ক্ষুদ্র গ্রামমাত্র ছিল তখন নাটোর শহর গৌরবের শীর্ষে অবস্থিত। নাটোর ছিল রাজধানী। ঢাকা, মুর্শিদাবাদ ও কৃষ্ণনগরের সমকক্ষ ছিল নাটোর। সে সময় কলকাতা শহর কেবল গড়তির মুখে।’ নাটোর শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির উর্বর চারণভূমি। সুদূর অতীতে অসংখ্য কৃতবিদ্য কীর্তিমান পুরুষ ও সাহিত্যসাধক তাদের সুচিন্তার অনন্য ফসল ফলিয়েছেন। সাহিত্যের সুবিশাল ক্যানভাসে বাণী শিল্পের সাধনায় যারা অমরত্ব লাভ করেছেন, স্বল্প পরিসরে, সময়াভাবে এ নিবন্ধে তাদের পরিচিতির উদ্ভাসন অতি দুরূহ ব্যাপার। সোনালি মায়াবী অতীতে রাজা রামকৃষ্ণ রায় ছিলেন একাধারে কবি, সাধক ও সংগীতজ্ঞ। তার রচিত ও সুরারোপিত শ্যামাসংগীত রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের পরম প্রিয় ছিল। সুরের আরাধনায় তিনি মগ্ন থাকতেন। নাটোরের গুণধর মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের বিশেষ প্রিয়ভাজন ছিলেন। কবি গুরু তাকে ‘রাজন’ এবং অবনীন্দ্রনাথ তাকে ‘নাটোর’ বলে ডাকতেন। ঠাকুর বাড়িতে প্রথমে ‘ড্রামাট্রিক ক্লাব’ পরে ‘খামখেয়ালী সভায়’য় সম্মানিত সদস্য হন। রবীন্দ্রনাথের ‘বৈকুণ্ঠের খাতা’ নাটকের অভিনয়ে রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং ‘কেদার’ ও নাটোরের মহারাজা ‘অবিনাশের’ ভূমিকায় অভিনয় করেন। মহারাজ ১৯১৪ সালে ২২ ফেব্রুয়ারি পাবনায় উত্তরবঙ্গ সাহিত্য সম্মিলনের ৭ম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। সেখানে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন প্রধান অতিথি। ১৯২৫ সালে ১০ ও ১১ এপ্রিলে মুন্সীগঞ্জে বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলনের ষোড়শ বার্ষিক অধিবেশনে মহারাজ সভাপতিত্ব করেন। সেখানে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ও সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উপস্থিত ছিলেন। মহারাজাকে ‘সন্ধ্যাতারা’র কবি বলা হয়। তিনি সন্ধ্যাতারা, অনামিকা, প্রভৃতি কাব্য রচনা করেন। ‘নূরজাহান’ ও ‘দারার দূরদৃষ্ট’র মতো ইতিহাসনির্ভর গ্রন্থ ছাড়াও তিনি ‘শ্রুতি-স্মৃতি’ নামক আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ রচনা করেন। ‘তাজ সুন্দরী’ নামেও একটি গ্রন্থ ছিল তার। সম্পাদনা করতেন ‘মানসী’ এবং ‘মানসী ও মর্ম্মবাণী’ নামে দুটি পত্রিকা। ইংল্যান্ডের পরে সর্বভারতীয় ক্রিকেট অঙ্গনে তাকে ক্রিকেটের জনক বলা হয়। তিনি ১৯০১ সালে কলকাতায় ‘নাটোর ইলেভেন’ নামে একটি ক্রিকেট দল গঠন করেন। মহারাজের সুপুত্র যোগীন্দ্রনাথ রায়ও সাহিত্য সাধনা করতেন। ‘রজনীগন্ধা’ নামে তারও একটি কাব্য ছিল। শরৎকুমার রায় (১৮৭৬-১৯৪৬) রাজশাহীতে বরেন্দ্র জাদুঘর তৈরি করেন ১৯১৬ সালে। তার বিখ্যাত গ্রন্থ ‘তিলি জাতি’ ও ‘মোহনলাল’। মোহসেনউল্লাহ সরকার রচনা করেন ‘বুড়ীর সুতা’। নাটোরের সন্তান স্যার আচার্য যদুনাথ সরকার (১৮৭০-১৯৫৮) বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তা। তিনি ১৯২৬-১৯২৮ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য ছিলেন। ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডিলিট প্রদান করেন। তিনি ১৯২৯ সালে ‘নাইট’ উপাধিও পান। নাটোরের রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ পরিবারের বধূ ময়মনসিংহের গৌরীপুরের শিল্প-সংগীতপ্রেমী জমিদার ব্রজেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর কন্যা হেমন্তবালা দেবী (১৮৯৪-১৯৭৬) সাহিত্যচর্চায় মগ্ন ছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তার প্রতিভার দীপ্তিতে মুগ্ধ হয়ে ‘চিঠিপত্র (৯ম খণ্ড)’-এর পুরোটাই হেমন্তবালা ও তার আত্মীয়দের লিখেন। পত্রলিপি সংকলনটিতে ৩২১টি পত্রের মধ্যে ২৬৪টি পত্রই লিখেন হেমন্তবালাকে। এ ঘটনা নাটোরের জন্য এক গৌরবময় অধ্যায়। ‘শেফালিকা’ কাব্যখ্যাত রাজকুমারী ইন্দ্র প্রভা দেবী নাটোরের দিঘাপতিয়ার রাজা প্রমথনাথ রায়ের কন্যা এবং কুমার শরৎকুমার রায়ের ভগিনী। তার আরও কয়েকটি গ্রন্থ, প্রেমপত্র ও দিনলিপির সন্ধান পাওয়া গেছে। তার একটি ‘আত্মকথা’ সম্প্রতি নাটোর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আবিষ্কৃত ও প্রকাশিত হয়েছে। নাটোরের অন্যতম কবি রাধাচরণ চক্রবর্তী (১৩০১-৪৫ বঙ্গাব্দ)। তিনি তৎকালে ‘প্রবাসী’, বসুমতী’, ভারতবর্ষ,’ বিচিত্রা’, ভারতী’ বঙ্গবাণী,’ বঙ্গলক্ষ্মী’, প্রভৃতি পত্রিকায় লিখতেন। ‘আলেয়ার কবি’ নামে খ্যাত এ শক্তিধর কবির অন্তত ৪টি কাব্য, ৭টি উপন্যাস ও ৩টি গল্পগ্রন্থ ছিল। নাটোরে জন্ম নেওয়া সাহিত্য সাধক প্রমথনাথ বিশী (১৯০১-১৯৮৫) বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। একাধারে কবি, নাট্যকার, গবেষক, সমালোচক, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, অভিনেতা, রম্য লেখক, ছড়াকার, সম্পাদক, অনুবাদক, কলামিস্ট ও রাজনীতিবিদ। তার গ্রন্থ সংখ্যা ১২০ এর ঊর্ধ্বে। ‘কেরী সাহেবের মুন্সী’ গ্রন্থের জন্য তিনি ১৯৬০ সালে রবীন্দ্র পুরস্কারে ভূষিত হন। নাটোরের আরেক গর্বিত সন্তান, কবি, নাট্যকার, সাংবাদিক গজেন্দ্রনাথ কর্মকার ‘খতিয়ান’, ও ‘হীরক জয়ন্তী’ নামক দুটি কাব্যের জনক। নাটোরের অক্ষয়চন্দ্র চক্রবর্তী একজন গবেষক ও সুসাহিত্যিক। চিন্তা রেখা, প্রেম রেখা, মা প্রভৃতি গ্রন্থ তার অমর কীর্তি। জয়নাথ বিশী একজন সাহিত্যিক। তিনি ‘দেবী যুদ্ধ; ও ‘পদ্মপুরাণ’, নামে ২টি গ্রন্থ রচনা করেন। শৈলেশনাথ বিশী রচনা করেন ‘সালোমে, বলশেভিকবাদ, চিন্তাকর্তা প্রভৃতি গ্রন্থ। রঘুনাথ সুকুল ‘কেয়া’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। তিনি ‘মেঘদূত’ ও ‘রঘুবংশ’, নামক কয়েকখানা সংস্কৃত গ্রন্থও বাংলায় অনুবাদ করেন। শেখ জুমন উদ্দীন ছিলেন একজন প্রতিভাবান কবি। কাব্য ছাড়াও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ‘কাব্য নাট্য’র রচনাকার তিনি।
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে নাটোরের চৌধুরী বংশের মেয়ে সুলতানা জামান বাংলা সিনেমার স্বনামধন্য অভিনেত্রী ছিলেন। তিনি লেখালেখিতেও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। এ ছাড়া, দেবেশ চন্দ্র রায়, নিবারণ চন্দ্র মজুমদার, রাজময় বাগচী, রক্ষাকর বাগচী, উমেশ চন্দ্র মৈত্রেয়, উমানন্দ ব্রহ্মচারী, অনাথ বন্ধু বাগচী, শ্রীনাথ কর্মকার, তারিণীচরণ ঠাকুর, দুর্গাদাস ঠাকুর, মনোমোহন কর, গিরীশ চন্দ্র লাহিড়ী, দুর্গানন্দ সান্যাল, সুরেশ চন্দ্র রায়, পণ্ডিত গিরিজাকান্ত গোস্বামী, সুরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, প্রবোধ চন্দ্র চক্রবর্তী, কিশোরী মোহন বসাক, আশুতোষ সান্যাল, রাজকুমারী কিরণলেখা রায়, ড. নরেন্দ্রকৃষ্ণ সিংহ, রাধেশ চন্দ্র গোস্বামী, বীরেন্দ্রনাথ মুকুটমণি, প্রবোধ চন্দ্র মৈত্রেয়, কমলা বাগচী, মোহিতকুমার মৈত্রেয়, কবীন্দ্রকুমার মজুমদার, অন্নদামোহন বাগচী, সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী, মহেন্দ্রনাথ পণ্ডিত, হাসার উদ্দীন কবিরত্ন, সাদেকুন নবী, হরিপদ দাস, কালি প্রসন্ন সরকার, জয়ন্ত সাহা রায়, আবদুর রহমান আব্বাসী (কবি শেখর) আব্দুল হামিদ, এস.এম. আব্দুল লতিফ, শফীউদ্দীন সরদার, ড. মজিরউদ্দীন মিয়া, ড. চিরশ্রীবিশী চক্রবর্তী মহুয়া, সনৎকুমার সাহা, গণেশ পাল, আখতার হুসেন, শচীনন্দন পাল, ড. মকসুদুর রহমান, সমর পাল, জিএম ইকবাল হাসান, খালেদ বিন জালাল, গোলাম কামরান, ড. সুজিত সরকার প্রমুখ বাংলা সাহিত্যে ও বাণী শিল্পের বেদিতলে নিজেদের সমর্পণ করেছেন।
অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ ‘চলনবিলের ইতিকথা’সহ অন্তত ৬টি গ্রন্থের রচয়িতা। নাটোরের অনন্য সাহিত্যসাধক শফীউদ্দীন সরদার অনেক সদ্গ্রন্থের জনক। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, নাট্যকার ও মঞ্চাভিনেতা। কাব্য ও ঐতিহাসিক উপন্যাস মিলিয়ে কমপক্ষে ২২টি গ্রন্থ রয়েছে তার। ড. মজির উদ্দীন মিয়া ছিলেন নন্দিত গবেষক, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। সনৎ কুমার সাহা একজন বরেণ্য অর্থনীতিবিদ ও সাহিত্যিক। তিনি একাধারে প্রাবন্ধিক, ছোট গল্পকার, গবেষক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য। রবীন্দ্র গবেষক হিসাবেও খ্যাতিমান। তিনি সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতি স্বরূপ প্রবন্ধে ২০১২ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন এবং ১৪১৭ বঙ্গাব্দে মননশীল শাখায় ‘প্রথম আলো বর্ষসেরা’ গ্রন্থের পুরস্কারে ভূষিত হয় তার ‘কবিতা অকবিতা ও রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থটি। ড. মকসুদুর রহমান একজন গবেষক ও প্রাবন্ধিক; তার উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা : বাংলাদেশের স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন, নাটোরের মহারাণীভবানী, নাটোরের গৌরব, রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান : তত্ত্ব ও নীতিমালা, রাষ্ট্রীয় সংগঠনের রূপরেখা ও বঙ্গভঙ্গ এবং বাঙালির ঐক্য প্রভৃতি। সমর পাল একজন একনিষ্ঠ গবেষক, প্রাবন্ধিক ও সমাজেতিহাসবেত্তা। বাইশটির অধিক গ্রন্থের জনক এই অবসরপ্রাপ্ত জনপ্রশাসক ছড়া ও কবিতাও রচনা করেছেন বিস্তর। জাকির তালুকদার পেশায় চিকিৎসক কিন্তু মূলত ভাষাচিত্রী। ছোটগল্পই তার সৃজনীরচনার প্রধান ভূখণ্ড; তবে, কুরসীনামা, হাঁটতে থাকা মানুষের গান, বহিরাগত, মুসলমান মঙ্গল, পিতৃগণ, কবি ও কামিনী, ছায়াবাস্তব প্রভৃতি শিরোনামে সার্থক উপন্যাসও রচনা করেছেন তিনি। এতসব কৃতীর কিছুটা প্রতিদানে, কথাসাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভের পাশাপাশি, পেয়েছেন: অন্যান্য আরও পুরস্কার। অতিসম্প্রতি, তার সম্পাদিত ‘বাঙ্গাল’: সাহিত্য ও চিন্তার কাগজ [প্রথম বর্ষ, প্রথম সংখ্যা : জুলাই ২০২১], বাংলাভাষী মানুষের মনোজগতকে আলোড়িত করেছে ও করছে।
রহমান হেনরী আধুনিক বাংলা কবিতায় এক অনন্য নাম। ‘সার্কাস মুখরিত গ্রাম’ কাব্যের জন্য বিশেষভাবে খ্যাত এবং গত শতাব্দীর উনিশশ নব্বইয়ের দশকে আবির্ভূত এ কবির মৌলিক কবিতাগ্রন্থ অন্তত ১৮টি; চার হাজারের অধিক কবিতার জনক রহমান হেনরী বিশ্বসাহিত্য থেকে অনুবাদ করেছেন পাঁচ হাজারেরও অধিক কবিতা। অনুবাদ বলার চেয়ে সেগুলোকে ‘বাঙলায়ন’ বলতেই তিনি অধিক সাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এ যাবত কবিতায় ও সাহিত্যে নোবেলজয়ীদের বাংলায়নকৃত কবিতা নিয়ে প্রকাশিত বাংলাভাষার প্রথম ও এখন অবধি একমাত্র সংকলনটি [নোবেলজয়ীদের কবিতা, ২০১২; দ্বিতীয় সংস্করণ ২০১৮] তারই। অধিকন্তু, জানামতে, বাংলাভাষার অন্য কোনো কবি তার চেয়ে অধিকসংখ্যক বিশ্বকবিতার অনুবাদ/বাংলায়ন করেননি। তিনি ঢাকা থেকে ‘পোয়েট ট্রি’ নামক একটি কবিতাকাগজও সম্পাদনা করেন। ড. সুজিত সরকার নন্দিত গবেষক, মননশীল প্রাবন্ধিক। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। তার গ্রন্থগুলোর মধ্যে নাটোর জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, সাহিত্য ভাবনা, অন্যতম। কার্তিক উদাস সাহিত্য-সংগীতে নিবেদিত প্রাণ। ড. চিরশ্রী বিশী চক্রবর্তী প্রমথনাথ বিশীর কন্যা। তার লেখা গ্রন্থগুলো : আমার বাবা : কিছু স্মৃতি কিছু বিস্মৃতি; ‘আমার একটি কথা বাঁশি জানে’, ছায়াপাখি, শেষ নাহি যে, ইত্যাদি। দিল্লি থেকে আন্তর্জাতিক প্রথম বাংলা পত্রিকা ‘প্রতীচী’র সম্পাদক। এ ছাড়াও, এ জেলার যারা বাংলা সাহিত্যে যারা অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য: কবি হাসার উদ্দীন কবিরত্ন এবং দেবেশ চন্দ্র রায় (বেদুইন), যিনি প্রায় ১০০ গ্রন্থের প্রণেতা।
সাহিত্যজগতে, প্রত্যেক সমকালেই নাটোরের ইতিহাস ত্রিরত্নে-গড়া। সেকালে, ‘সন্ধ্যাতারার কবি’ মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায়, জগদ্বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তা আচার্য যদুনাথ সরকার এবং বহুরৈখিক সাহিত্যমেধা প্রমথনাথ বিশী মহাশয়ের উজ্জ্বল উপস্থিতি যে জ্যোতির্বলয় সৃষ্টি করেছিল; পুনরাবৃত্ত ইতিহাসে, কালের পরিক্রমায়, শক্তিমান কথাসাহিত্যিক জাকির তালুকদার, প্রাতিস্বিক-প্রতিভা তথা কবি ও অনুবাদক রহমান হেনরী এবং আমাদের কালের সুধীন্দ্রনাথ দত্ততুল্য কবি-প্রতিভা বদরে মুনীরও সেই সমরূপ ত্রিবৃত্তিও জ্যোতির্ময়তাকে আসন্ন করে তুলেছে।
বর্তমানে, দেশে ও বিদেশে অবস্থানরত নাটোরের যেসব প্রতিভা সাহিত্যে ও সৃজনী শিল্পের নানা শাখায় অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন, তাদের মধ্যে স্বনামখ্যাত : জাকির তালুকদার, রহমান হেনরী, বদরে মুনীর, আবু আসিফ মার্শাল, সেলিম রেজা নিউটন, কার্তিক উদাস, ড. ফজলুল হক সৈকত, আশীক রহমান, সুখময় রায় বিপ্লু, এম আসলাম লিটন, সন্দ্বীপন স্যান্নাল, লতিফুল ইসলাম শিবলী, মলয় সাহা, রিপন মাহমুদ, শাহানা আকতার মহুয়া, কামাল খাঁ, দেবাশীষ সরকার, নাজমুল হাসান, আতোয়ার হোসেন প্রমুখ।
