'আমি পাপী! আমি অন্যায়কারী! আপনার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে আমি অন্যায় করেছি, অমার্জনীয় পাপ করেছি! বহু রক্তে রাঙিয়েছি এ হাত। আপনার সঙ্গী সাথীদের অনেকের রক্ত ঝরিয়েছি আমি। অনেকের প্রাণ কেড়ে নিয়েছি। ওহুদের প্রান্তরে শুধু আমার জন্যই অমন বিপর্যস্ত অবস্থায় পড়েছিলেন আপনারা! আমি আপনার সাক্ষাত বিজয়ের ওপর পরাজয়ের বিষ ঢেলে দিয়েছি! হে আল্লাহর বাণীবাহক, শুধু আমারই কারণে আপনার মুখের দাঁত ভেঙেছে সেদিন। আপনি ক্ষত-বিক্ষত হয়ে আঁছড়ে পড়েছেন যুদ্ধের ময়দানে। ঘাতক ইবনে কামিয়াকে আমিই লেলিয়ে দিয়েছি। আপনার পিতৃতুল্য চাচা সিংহশিকারী হামজা! আমি জানতাম, তাকে ওরা মেরে ফেলবে! অথচ আমি সব জেনেও সেদিন চুপ ছিলাম। আপনার মাথার ওপর থেকে হামজার ছায়া মুছে দিয়েছে আমারই নীরবতা। হে আল্লাহর রাসূল, মুসলিমদের ধ্বংস করার জন্য এমন কোনো কাজ নেই যা আমি করিনি।
আমাকে কি মাফ করবেন আপনার আল্লাহ? আমাকে কি ঠাঁই দেবেন তাঁর ক্ষমার আশ্রয়ে? হে আল্লাহর বাণীবাহক, আমি আজ লজ্জিত মুখে আহত উটের মতো আপনার সামনে হাজির হয়েছি। আমাকে আপনি হত্যা করুন। আপনার তরবারি দিয়ে আমার মস্তক ছিন্ন করে দিন। আমাকে মুক্তি দিন এই পাপের জীবন থেকে। আমাকে সাজা দিন ৷ যত কঠিন সাজাই হোক, তা আমি মাথা পেতে নেব। আপনি কোনো সাজা না দিলে নিজেকে কখনোই মাফ করতে পারব না আমি। মৃত্যু ছাড়া আমার মুক্তি নেই। হয় আপনি আমাকে হত্যার আদেশ দিন, নয়তো বলুন, নিজেই নিজেকে শেষ করে দেব আমি।'
খালিদের কথা শুনে মুখের হাসি আরেকটু বিস্তৃত করে মুহাম্মদ (সা) বললেন,
'তুমি কোন অপরাধের কথা বলছো? আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের নামে স্বাক্ষ্য দেওয়ার পর তো তুমি কোনো অপরাধ করোনি। ইতোপূর্বে যা কিছু করেছো তোমরা, পবিত্র শাহাদাত বাক্য পাঠ করার সাথে সাথে পূর্বের সব অপরাধ মাফ হয়ে গেছে।'
খালিদ বিন ওয়ালিদের নাম শুনেনি, দুনিয়ায় এমন মানুষ পাওয়া বিরল। আর যাদের যুদ্ধ, সেনাপতি, যুদ্ধ ময়দান, ঢাল- তলোয়ার, যুদ্ধ কৌশল সম্পর্কে জানাশোনা আছে কিংবা জানার জন্য বই পুস্তক পড়েছে, তাদের কাছে তো খালিদ এমন এক মানুষের নাম, যিনি শুধু মাত্র এক সেনাপতি নন, নন কোন সাধারণ যোদ্ধাও। তিনি অপরাজেয়, ঠিক আমাদের মনে সেই প্রবৃত্তির মতো যাকে ক্ষণিকের জন্য আটকে রাখা যায় মাত্র কিন্তু বেঁধে ফেলা যায় না। যায় না পোষ মানানোও।
ছোটবেলা থেকে খালিদের বীরত্বের কথা শুনে আসছি বড়দের মুখে মুখে। গ্রামের ইসলামি ওয়াজ মাহফিলগুলোর একটি বড় অংশজুড়ে থাকে খালিদের অসম্ভব সব বিজয়গাঁথা। তবে বাংলা সাহিত্য অঙ্গন?
প্রশ্ন করলেও যা, না করলেও তাই। উত্তর তো নেই আমাদের কাছে। কেন নেই? খালিদের মতো এমন এক চরিত্র নিয়ে কাজ করা হয়নি কেন, এর কৈফিয়ত কার কাছে চাইবো? বাংলা ভাষা? নাকি যারা বাংলা ভাষায় লিখেন? আমি জানি না।
মৃদুল ভাইয়ের লেখার সাথে আমার পরিচয় সেই ছোটবেলায়। বয়সেও আমার থেকে চার বছরের বড় হলেও আমরা মিশেছি বন্ধুর মতো। অনেকেই আমাকে ভাইয়ার সেনাপতি বলে। আমি খুশি মনে মেনে নেই। সেই অনেকের কথাতেই কিনা জানিনা, খালিদের জীবনের উপর ভিত্তি করে একটা উপন্যাস লেখার তাগিদ দিচ্ছিলাম ওকে, প্রায় দুই হাজার তের সাল থেকে। অবশেষে ফল মিললো। দুই হাজার তেইশে এসে পেলাম, খালিদ- ব্লাড. ওয়ার. অনার.। প্রকাশিত হয়েছে নালন্দা প্রকাশনী থেকে।
মৃদুল ভাইয়ের বই আকারে প্রকাশিত সকল লেখার প্রথম পাঠক আমি। এবং সমালোচকও আমিই। এমন নির্মমভাবে সমালোচনা আমি কখনো আমার নিজের লেখারও করিনি। এমনকি করিনি বাপের টাকা খরচ করে লাম ছাম লিখে বই প্রকাশ করা লেখকের লেখারও। সেই আমার কাছে খালিদ এক অন্যন্য উপন্যাস। যা বাংলা ভাষায় অদ্বিতীয়।
খালিদ উপন্যাসের শক্তিশালী দিক এতো যে, লিখতে গেলে আশি নব্বই পেইজ লেখা যাবে। হয়ে যাবে আস্ত একটা সমালোচনা গ্রন্থ। তবে আমি বিশেষ ভাবে বলবো, ইসলাম পূর্ববর্তী আরবের বর্ণনার কথা। ঐ সময়ের বর্ণনা এতো দারুণ আর বিশ্বাসযোগ্য ভাবে এসেছে যে, পড়তে গিয়ে বার বার আমার বর্তমান সময় নিয়ে মনের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। সত্যিই আমি বর্তমানে আছি তো? নাকি বাস করছি জাহিলিয়াতের সেই যুগে। যেখানে গানের তালে তালে, নৃত্যের তালে তালে উন্মোচিত হতে থাকে নারীর কলাবতী ফুলের মতো নরম শরীর।
'তাল বদলাল বীণা বাদকের দল। দফ আর ঢোল হাতের যন্ত্রীরা গতি বাড়াল আরও। এবারে পূর্ণ খাপমুক্ত হলো তরবারি। সূর্যের আলোয় যেমন ঝলকে ওঠে তপ্ত মরুর বালুরাশি, সেইভাবে ঝলকে ঝলকে উঠলো খাপখোলা তরবারির ধার! সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে গেল নৃত্যরত মেয়েরা। শুধু মুখের নেকাব ছাড়া আর কোন বাহুল্য রইলো না কারও গায়ে। কুমারী-যুবতী নারীদের আপাদমস্তক নগ্ন শরীরগুলো অল্প জলে খলবল করতে থাকা মাছেদের মতো ঝিকমিক করতে লাগলো আঙিনাজুড়ে। দেবমূর্তির গা থেকে খসে পড়ল আরও একপাট মখমল।
চুড়ান্ত উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল জনতা। বিষ্ময়ে বিমূঢ় তাদের চোখগুলোতে যেন আগুন ধরিয়ে দিয়েছে নৃত্যরত নারীদের নগ্ন দেহের কাব্যকলা।
'হুবলের জয়! উজ্জার জয়" লাত-মানাতের জয়!' সমবেত জনতা জয়োধ্বনি দিয়ে উঠলো।
খালিদ পড়তে গিয়ে মনে হচ্ছিলো, আমি এই সময়ের নই। আমিও আরবের ঐতিহাসিক কোন চরিত্র। আমার চোখের সামনেই বাবার অহংবোধের কারণে খুন হচ্ছে, চাঁদের মতো সুন্দর কন্যাশিশু। আমারই চোখের সামনে খরস্রোতা নদীর মতো বয়ে যাচ্ছে আল ওয়ালিদের পুত্র খালিদের জীবন, তার দস্যিপনা, যুদ্ধ, যুদ্ধ কৌশল, জয় আর জয়।
খালিদ উপন্যাসের কি কোন নেগেটিভ দিক নেই? অবশ্যই আছে। খালিদের নেগেটিভ দিক খালিদ চরিত্র নিজে। সে যা করে তাই সঠিক মনে হয়। অস্ত্রের আঘাতে ছিন্নভিন্ন করে দেয় মুসলিম সৈন্যের মাথা। সেটাকেও মনে, ঠিকই আছে। খালিদের শৌর্যবীর্যের কাছে কার সাধ্য আছে যে দাঁড়ায়। এমনকি মহানবীর বিপক্ষে জয়কেও মনে হয়, কোথাও ভুল নেই, কোথাও গড়মিল নেই। সাইফুল্লাহ হওয়ার জন্য এমন হওয়া দরকারই ছিলো।
খালিদ- ব্লাড. ওয়ার. অনার. এখন পর্যন্ত গত কয়েক বইমেলায় প্রকাশিত আমার পড়া বইগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। এর কোন তুলনা দিতে চাইনা। দিতে চাইনা শ্রেষ্ঠত্বের তকমাও। তবে এটা আমার ভবিষ্যতে পড়া ঐতিহাসিক উপন্যাসের মানদন্ড হয়ে থাকবে।
উপন্যাস- খালিদ- ব্লাড. ওয়ার. অনার.
প্রকাশনী- নালন্দা
পৃষ্ঠা- ৪২৪
মলাট মূল্য- ৮৫০৳
রেটিং- পাঁচে চার দশমিক নয় নয়।
