বড়াইগ্রাম উপজেলার জোনাইল ইউনিয়নের চৌমুহন গ্রামে ঝাড়ফুক দিচ্ছেন কথিত ‘জীনের বাদশা’। ছবি : নাটোরভিউ২৪
বড়াইগ্রাম উপজেলার জোনাইল ইউনিয়নের চৌমুহন গ্রামে কথিত ‘জীনের বাদশা’দের একটি সংঘবদ্ধ প্রতারণা চক্র গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এই ছোট গ্রামেই অন্তত ৩৭ জন কথিত জীনের বাদশা এবং তাদের প্রায় ১৮৫ জন সহযোগী সক্রিয় রয়েছে। পাশাপাশি পাশের কুশমাইল ও সংগ্রামপুর এলাকাতেও আরও ৮ থেকে ১০ জন একই ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইউটিউব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে অলৌকিক ক্ষমতার প্রচার চালিয়ে তারা দেশে-বিদেশে অবস্থানরত প্রবাসীদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। স্থানীয় ও ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, মূলত মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে বসবাসরত প্রবাসীরাই এই চক্রের প্রধান টার্গেট। অসুস্থতা, পারিবারিক সমস্যা বা ব্যক্তিগত সংকটের সমাধানের আশ্বাস দিয়ে কথিত তান্ত্রিক ও কবিরাজ পরিচয়ে অর্থ আদায় করা হয়।
সৌদি আরব প্রবাসী বগুড়ার বাসিন্দা দয়াল খান জানান, দীর্ঘদিন ধরে তার মেয়ে অসুস্থ থাকায় বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা করেও কোনো সুফল পাননি। পরে ইউটিউবের মাধ্যমে চৌমুহন গ্রামের কথিত ‘জীনের বাদশা’ ইমরানের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। মেয়েকে সুস্থ করার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন সময়ে তার কাছ থেকে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসা চললেও শিশুটির অবস্থার উন্নতি হয়নি, বরং আরও অবনতি হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আরও জানান, পরে তাকে আরও কয়েকজন কথিত জীনের বাদশার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। টাকা ফেরত চাইলে তাকে হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি। বাধ্য হয়ে তিনি সৌদি আরব থেকেই বড়াইগ্রাম থানায় ৪-৫ জনের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। তবে এখনো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার। অন্যদিকে মৌলভীবাজারের বাসিন্দা বদরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তার এক নারী আত্মীয় যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন। পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সমস্যার সমাধানের আশায় ইউটিউবের ভিডিও দেখে তিনি চৌমুহন গ্রামের কয়েকজন কথিত জীনের বাদশার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিভিন্ন সময়ে ওই প্রবাসী নারীর কাছ থেকে ৪-৫ লাখ টাকা নেওয়া হয় বলে দাবি করেন তিনি। পরবর্তীতে টাকা দেওয়া বন্ধ করলে ক্ষতির ভয় দেখানো হয় বলেও অভিযোগ ওঠে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব কথিত জীনের বাদশারা এক সময় কৃষিকাজ বা শ্রমিকের কাজ করলেও এখন তারা বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। জোনাইল বাজার এলাকায় তাদের বিলাসবহুল কফি শপ, একাধিক বহুতল ভবন ও গাড়ির মালিকানার কথাও শোনা যায়। রাতভর জীন-ভূত সংক্রান্ত ভিডিও ধারণ ও অনলাইন প্রচারণা চালানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া গ্রামের বিভিন্ন প্রবেশপথে গাছে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করে নজরদারি চালানো হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের চলাচলে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের। স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে শতশত প্রবাসী একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন। দুর্বলতা ও বিশ্বাসকে পুঁজি করে একটি শক্তিশালী আর্থিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হয়েছে বলে তারা মনে করেন।
বড়াইগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুস ছালাম জানান, বিষয়টি জানার পর চৌমুহন গ্রামে অভিযান চালিয়ে ভিডিও ধারণের কয়েকটি স্পট ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযুক্তরা পালিয়ে থাকায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
