বড়াইগ্রামে শ্রমিকের হাটে শ্রমজীবী মানুষের ভিড়। ছবি : নাটোরভিউ২৪
অতীতের দাসপ্রথা এখন আর নেই। তবে আধুনিক যুগে এসেও বড়াইগ্রামের রয়না ভরটে তৈরি হয়েছে ব্যতিক্রমধর্মী শ্রমিকের হাট। স্থানীয়ভাবে ‘কামলার হাট’ নামে পরিচিত এ হাটে প্রতিদিন বিভিন্ন জেলা থেকে শত শত দিনমজুর আসেন শ্রম বিক্রি করতে।
কাক ডাকা ভোরে শরীরে শীতের কাপড় জড়িয়ে কাস্তে-কোদাল নিয়ে পনের থেকে ষাটোর্ধ বয়সের শ্রমিকরা সমবেত হন এ হাটে। ভোর থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত চলা এ হাটে পণ্যের মত নিজেদের শ্রম কেনাবেচা হয় দর-কষাকষি করে। ভাল মজুরি পাওয়ায় শ্রমিকদের পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ মধ্যবৃত্তরাও এখানে শ্রম বিক্রি করতে আসেন। প্রতি বছর ধান কাটাসহ বিনা চাষে রসুন রোপণ ও উঠানোর মৌসুমে এ হাট জমে উঠে।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ট্রাক, লেগুনা, পিকআপে চেপে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ, রায়গঞ্জ ও উল্লাপাড়াসহ পাশ্ববর্তি বিভিন্ন উপজেলা থেকে শত শত শ্রমিক এখানে শ্রম বিক্রি করতে এসেছেন। বগুড়া, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা থেকেও এসেছেন অনেকে। প্রায় দেড় যুগ ধরে চলা এ শ্রম বিক্রির হাটে পুরুষের পাশাপাশি দেখা মেলে নারী শ্রমিকেরও। এই হাটে শ্রমিকরা যেমন শ্রম বিক্রি করতে আসেন, তেমনি শ্রম কিনতে আসেন স্থানীয় গৃহস্থরাও। এখানে শ্রম বিক্রির জন্য অপেক্ষা করেন শ্রমিকরা। সারাদিনের শ্রমের দর-দাম ঠিক হলেই চলে যান গৃহস্থের সঙ্গে।
প্রতিটি শ্রমিক সারাদিনের জন্য কেনাবেচা হচ্ছেন ৬০০-৭০০ টাকায়। আবার কেউ কেউ বিঘা প্রতি টাকার অঙ্ক নির্ধারণ করে চুক্তিতে ধান কাটা বা রসুন রোপণের কাজ করেন। তাতে দুই বেলা খাবারসহ জনপ্রতি ৮০০-১০০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি মিলে। তবে একই সমান কাজ করলেও নারীদের ৪০০-৪৫০ টাকা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ নারী শ্রমিকদের।
সিরাজগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা শ্রমিকরা কাজ শেষে সন্ধ্যায় বিভিন্ন যানবাহনে চেপে বাড়ি ফিরে যান। তবে দুরবর্তী জেলা থেকে আসা শ্রমিকরা স্থানীয় স্কুল, বিভিন্ন মার্কেটের বারান্দাসহ বিভিন্ন স্থানে রাতযাপন করেন।
সিরাজগঞ্জের হরিণচড়া থেকে আসা মহসিন আলী ও আদম আলী জানান, এ হাটে ভাল মজুরিতে সহজেই কাজ জোটে। তাই ভোরে ট্রাক-পিকআপভ্যানে যাতায়াত ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও স্ত্রী-সন্তানদের ভরণপোষণ যোগাতে এ হাটে শ্রম বেচতে আসেন তারা।
কৃষি অধিদপ্তর ও কৃষকরা জানান, দক্ষিণ চলনবিলের বড়াইগ্রাম, গুরুদাসপুর, সিংড়া ও পাবনার চাটমোহর উপজেলায় একযোগে রবি শস্যের আবাদ শুরু হয়। চলনবিলের পানি নামার সঙ্গে সঙ্গেই জেগে উঠে আবাদী জমি। ধান কাটার পর রসুন, সরিষাসহ রবিশষ্য আবাদে ব্যস্ত হয়ে পড়ে কৃষক। এ সময় শ্রমিকের সঙ্কট দেখা দেয়ায় হাটে আসা বহিরাগত শ্রমিক দিয়ে গার্হস্থ্যরা সহজেই চাষাবাদ করতে পারেন।
চকপাড়া গ্রামের আবুল হোসেন জানান, ধানকাটা, জমি তৈরি ও বিনা চাষে রসুন রোপনের কাজ করানো হয় বহিরাগত এসব শ্রমিক দিয়েই। তাড়াতাড়ি করে ধান কেটে জমিতে ‘জো’ (উপযুক্ত) থাকতেই রসুন লাগাতে হয়। তাই হাটে উঠা বাইরের শ্রমিক পেয়ে কাজগুলো সহজ হয়। তাছাড়া শ্রমিক সঙ্কটে চাষাবাদ করাই কঠিন হয়ে পড়তো।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, প্রায় দেড় যুগ ধরে বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়ক ঘেঁষে রয়না ভরটে শ্রমিকের হাট বসছে। এ হাটে দরদাম করে প্রয়োজন মাফিক শ্রমিক নিতে পারেন গার্হস্থ্যরা। আবার শ্রমিকরাও সহজেই কাজ পান। এতে উভয়েরই সুবিধা হয়েছে।
