বাগাতিপাড়ার জামনগরে শাঁখারীপল্লীতে শাঁখা তৈরিতে ব্যস্ত কারিগররা। ছবি : নাটোরভিউ২৪
দুর্গাপূজাকে ঘিরে বাগাতিপাড়ার জামনগর ইউনিয়নের শাঁখারীপল্লীতে ঐতিহ্যবাহী শাঁখা তৈরির ধুম পড়েছে। পূজা মওসুমে চাহিদা বাড়ায় দিনরাত পরিশ্রম করে চলেছেন এখানকার কারিগররা। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বিবাহিত নারীর হাতে শাঁখা মানে সৌভাগ্যের চিহ্ন বলে মনে করেন।
প্রজন্মের পর পজন্ম ধরে এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন এখানকার শাঁখারীরা। সম্প্রতি এই শাঁখাশিল্প জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির প্রক্রিয়ায় রয়েছে। সেকারনে নাটোরবাসী এই স্বীকৃতির প্রত্যাশায় রয়েছেন।
শাঁখা কারিগর ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে সোনারগাঁ থেকে বাংলার রাজধানী ঢাকায় স্থানান্তরের সময় বিভিন্ন পেশার মতো সুবেদার ইসলাম খাঁ শঙ্খশিল্পীদের বাখেরগঞ্জ থেকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। পরবর্তী সময়ে রাজধানী মুর্শিদাবাদে সরিয়ে নিলে ঢাকার গুরুত্ব কমে যায়। তখন শঙ্খশিল্পীরাও বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েন। এর একটি বড় অংশ নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার জামনগর গ্রামে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে তোলেন। তাদের তৈরি শাঁখা ও গহনা আজও এই অঞ্চলে সমানভাবে পরিচিত ও সমাদৃত।
কারিগররা জানান, বহু বছর ধরে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত এখানকার মানুষ। বর্তমানে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ পরিবার পেশাকে আঁকড়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন। শাঁখা তৈরির মূল উপকরণ শঙ্খ ভারত ও শ্রীলঙ্কা থেকে আমদানি করা হয়। পুরুষরা শঙ্খ কেটে বালা, আংটি ও শাঁখার আকৃতি দেন। আর নারী কারিগররা নিপুণ কারুকাজে সেটিকে আকর্ষণীয় করে তোলেন। এক জোড়া শাঁখা তৈরিতে খরচ হয় ২০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত। তবে স্বর্ণালংকার ব্যবহার শাঁখা তৈরিতে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।
শাঁখা তৈরি কারখানা মালিক পল্টন কুমার দাস জানান, তারা শ্রীলঙ্কা থেকে শাঁখার কাঁচামাল আমদানি করেন। কাঁচামাল থেকে কেটে প্রস্তুত করা হয় কাঁচা শাঁখা, আর ডিজাইন করা হলে তাকে পাকা শাঁখা বলে। শাঁখার বিভিন্ন জাত রয়েছে। কারিগররা বিভিন্ন রকমের শাখা যেমন পাথর শাঁখা, সোনা শাঁখা, সাদা শাঁখা, কড়ি শাঁখা, মোটা ও চিকন শাঁখা, চূড়া শাঁখা, ব্রেসলেট শাঁখা, মান্তরা শাঁখা ইত্যাদি তৈরি করেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেমন রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, সিলেট, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও চট্টগ্রামে এগুলো বিক্রি হয়।
তিনি জানান, নবাবদের আমল থেকে এই শিল্প দেশের এক স্থায়ী ঐতিহ্য হিসেবে চলে আসছে।
কারিগর নিরেনচন্দ্র সেন জানান, এই ব্যবসা তাদের পরিবারে শত বছর ধরে চলে আসছে। তার বাপ-দাদারাও এই কাজ করেছেন। শাঁখারীপল্লীর ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান জানান, শুধূ দূর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে এবার শাঁখারীপল্লীতে ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার শাঁখাপণ্য বিক্রির আশা করছেন। জিআই স্বীকৃতি পেলে আগামীতে বিদেশেও শাঁখা রপ্তানির সুযোগ তৈরি হবে।
ব্যবসায়ী রিন্টু কুমার ধর বলেন, তিনি এই শাঁখারীপল্লী থেকে শাঁখা ও বিভিন্ন সামগ্রী কিনে সারা দেশ ঘুরে ঘুরে বিক্রি করেন। চাহিদা ও গুণগত মানের ভিত্তিতে এসব পণ্যের দাম নির্ধারিত হয়। জামনগর ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানী জানান, গ্রামের ৬০-৭০টি পরিবার শাঁখাশিল্পের সঙ্গে জড়িত। এরা নিম্নআয়ের মানুষ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। তার প্রত্যাশা, শাঁখাশিল্প জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পেলে বাগাতিপাড়াসহ নাটোরবাসীর জন্য গৌরবের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মারুফ আফজাল রাজন বলেন, জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেতে শাঁখাগুলোর নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদিত হলে বাগাতিপাড়ার শাঁখাকে জিআই পণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হবে।
