নদী সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ সময়ের দাবি


মতামত

রায়হান আহমেদ তপাদার

(২ বছর আগে) ৩ এপ্রিল ২০২৩, সোমবার, ১০:০৯ অপরাহ্ন

natoreview

গুরুদাসপুর ও চলনবিলের প্রধান নদী আত্রাই, নন্দকুঁজা, গুমানীসহ ১৬টি নদ-নদীতে পানি শুকিয়ে নৌ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে

অসংখ্য নদ-নদী নিয়ে ঘিরে আছে বলেই বাংলাদেশকে বলা হয় নদীমাতৃক দেশ। মাত্র ১ লাখ ৪৮ হাজার ৪৬০ বর্গকিলোমিটারের এই দেশে যত নদ-নদী রয়েছে তা দুনিয়ার অন্য কোনো দেশে নেই। নদ-নদীর কল্যাণে বাংলাদেশে মিঠা পানির উৎসও গর্ব করার মতো। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, দেশের সবচেয়ে মূল্যবান এ সম্পদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে আমরা এতটা যত্নবান নই।

যে কারণে দেশের নদনদীগুলো দখল-দূষণে বিপন্ন হয়ে পড়ছে। পৃথিবীতে খুব কম শহর আছে যার চারপাশে চারটি নদী রয়েছে। ঢাকা সেদিক থেকে অত্যন্ত সৌভাগ্যবান। কিন্তু অব্যাহত অবহেলা ও উদাসীনতার কারণে সেই সৌভাগ্য আজ দুর্ভাগ্যের রূপ নিয়েছে। নদীর পানি এতটাই নষ্ট ও দুর্গন্ধযুক্ত যে সেখানে ভ্রমণ তো দূরের কথা, নদীর পাড় দিয়ে হাঁটাও কষ্টসাধ্য। ক্রমাগত দখল, দূষণ ও ভরাটের কারণে সব নদী মৃতপ্রায়। শুষ্ক মৌসুমে পানি থাকে না বললেই চলে।
তুরাগ নদ ও এর সঙ্গে সংযুক্ত খাল-বিলে শত শত কারখানার অশোধিত তরল বর্জ্য নিয়মিতভাবে পড়ছে। কুচকুচে কালো পানি ব্যবহারের অনুপযোগী। টঙ্গী ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলের চিত্র একই। অনেক কারখানায় ইটিপি থাকলেও খরচ বাঁচাতে সেগুলো বন্ধ রাখা হয়। শুধু তরল বর্জ্য নয়, গৃহস্থালি বর্জ্যসহ কঠিন বর্জ্যও ব্যাপক হারে ফেলা হচ্ছে নদীতে। ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই তুরাগ ও বালু নদের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে।

রাজধানী ঢাকা মহানগরীর অস্তিত্ব অনেকাংশেই নির্ভর করে চারপাশের নদীগুলোর অস্তিত্বের ওপর। রাজধানীর পানীয় জলের উৎসগুলো ক্রমেই ধ্বংস হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী নদীগুলোর পানিতে লেড, ক্রোমিয়াম, ক্যাডমিয়ামসহ নানা ধরনের বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য অবমুক্ত হচ্ছে। এগুলো ভূগর্ভে প্রবেশ করে ভূগর্ভস্থ পানির উৎসকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

নদীর নাব্যতা না থাকলে ঢাকার পানি নিষ্কাশনও বাধাগ্রস্ত হবে। জলাবদ্ধতা স্থায়ী রূপ নেবে। প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশন শুধু তুরাগ নদের টঙ্গী থেকে কালিয়াকৈর পর্যন্ত ৪২ কিলোমিটার অংশে ২২৪টি এবং চিলাইয়ে পানিদূষণের ৪৫টি উৎস চিহ্নিত করেছে। কারখানার তরল বর্জ্যের কারণে তুরাগ খালের পানি আলকাতরার মতো ভারী হয়ে গেছে।
এই পানি লাগলে শরীর চুলকায়, ঘা হয়ে যায়। নদী রক্ষার দাবিতে আশির দশক থেকে নাগরিকরা আন্দোলন করছে। উচ্চ আদালত বারবার নদী রক্ষায় নির্দেশনা দিয়েছেন। ২০০৯ সালে দেওয়া ১২ দফা নির্দেশনার মধ্যে ছিল ক্যাডেস্ট্রাল সার্ভে বা সিএস মানচিত্র অনুযায়ী স্থায়ীভাবে নদীগুলোর সীমানা নির্ধারণ, নদীর পাড় দিয়ে ওয়াকওয়ে নির্মাণ, অনেক বৃক্ষরোপণ, নদীর মধ্যে থাকা সব ধরনের স্থাপনা উচ্ছেদ করা ইত্যাদি। কিন্তু সেই কাজগুলো এখন পর্যন্ত যথাযথভাবে সম্পাদন করা হয়নি।

দূষণ রোধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এখনো নদীর ওপর চলছে নানা ধরনের আগ্রাসী আয়োজন। পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা চরম উদাসীনতা দেখাচ্ছে। আমরা এই আত্মঘাতী উদাসীনতার অবসান চাই। একদিকে উজানে সীমান্তের ওপারে বাঁধ তৈরি করে এক তরফা পানি সরিয়ে নেয়ার ফলে বাংলাদেশের নদীগুলোতে দেখা দিয়েছে জল সঙ্কট।

অন্যদিকে, দেশের মধ্যেই অতিরিক্ত পলি জমে নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। নানা ধরনের শিল্প বর্জ্যের দূষণে নদীর প্রাণ বৈচিত্র্য এখন হুমকির মুখে। পাশাপাশি নদীর পাড় দখল করে, কিংবা নদীর বুকেই চলছে অবৈধ নির্মাণ। ফলে বহু নদী বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে হয়তো ইতোমধ্যেই হারিয়ে গিয়েছে, নয়তো কোন রকমে ধুঁকছে। সরকারি হিসেব মতে দেশে প্রায় ৪০০ নদী থাকলেও এদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক নদীতে শুকনো মৌসুমে কোন জল থাকে না।

ব্রিটিশ শাসনামলে জেমস রেনেল এই অঞ্চলের নদনদীর ওপর যে মানচিত্র তৈরি করেছিলেন, তা থেকেও বোঝা যায় গত ২০০ বছরে বাংলাদেশের নদনদীতে কতটা পরিবর্তন ঘটেছে। দেশে নদীর মোট সংখ্যা কত তা নিয়েও রয়েছে বিভ্রান্তি। প্রধান নদীর সংখ্যা মোট ৫৭টা। তিনটা নদী বাংলাদেশে ঢুকেছে মিয়ানমার থেকে।
বাকি ৫৪টা এসেছে ভারত থেকে। কিন্তু বাংলাদেশের ভূখন্ডের মধ্যেই নদীর সংখ্যা নিয়ে সরকারের একেক বিভাগের কাছে একেক ধরনের তথ্য রয়েছে। যা সত্যিই দুঃখজনক স্বাধীনতার পর বিআইডাব্লিউটিএ’র তরফে যে জরিপ হয়েছিল তাতে জানা গিয়েছিল বাংলাদেশে নদীপথের মোট দৈর্ঘ্য ২৪০০০ কিলোমিটার। কিন্তু এখন সেটা কমে দাঁড়িয়েছে ৮০০০ কিলোমিটার, এ থেকেই বুঝতে পারেন নদীগুলোর অবস্থা আসলে কেমন।

অর্থাৎ প্রায় চার দশকে ১৬০০০ কিলোমিটার নদীপথ শুকিয়ে গিয়েছে। কিন্তু যেখানে নদ-নদীর সংখ্যা নিয়েই কেউ একমত হতে পারছে না, সেখানে গত ৫০ কিংবা ১০০ বছরে বাংলাদেশে ক’টি নদীর মৃত্যু ঘটেছে, এ সম্পর্কে পাকা খবর কারো কাছেই নেই। তবে গবেষক এবং পরিবেশ আন্দোলনকারী সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, তারা ধারনা করছেন বাংলাদেশে গত প্রায় চার দশকে ৫০ থেকে ৮০টা নদী, শাখা নদী এবং উপনদীর অস্তিত্ব বিলীন হয়েছে।

পাশাপাশি ময়মনসিংহের পুরনো ব্রহ্মপুত্র, নেত্রকোনার মগড়া, কংশ ও সোমেশ্বরী, যশোরের ভৈরব, কপোতাক্ষ, ইছামতী, বেতনা, মুক্তেশ্বরী; কিশোরগঞ্জের নরসুন্দা, ঘোড়াউত্রা, ফুলেশ্বরী; খুলনার রূপসা, শিবসা, ডাকি, আত্রাই-এর মতো নদীগুলো এখন মৃত্যুর দিন গুণছে। একই চিত্র ফরিদপুরের কুমার, বগুড়ার করতোয়া, কুমিল্লার গোমতী, পিরোজপুরের বলেশ্বর, রাজবাড়ীর গড়াই, কুড়িগ্রামের ধরলা, গাইবান্ধার ঘাঘট, বান্দরবানের সাঙ্গু, খাগড়াছড়ির চেঙ্গী, নওগাঁর আত্রাই, জামালপুরের ঝিনাই নদীর। নদীর মৃত্যুর পেছনে কিছু স্বাভাবিক প্রাকৃতিক কারণ থাকে।

কিন্তু ফারাক্কা বাঁধ, তিস্তা ব্যারেজের মতো মানুষের তৈরি বাধার কারণেও মরে যাচ্ছে নদী। অন্যদিকে, দেশের সীমানার মধ্যেই নদীকে সহায়হীন মনে করে চলছে দখল উৎসব।নদীর তলদেশের ভূমি খাস জমি। এই জমি উদ্ধার করা কঠিন নয়। দেশের প্রতিটি থানায় কোথায় কোন্ নদী অবৈধ দখলের শিকার হয়েছে সে সম্পর্কে সিএস রেকর্ড থেকে সে সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য উদ্ধার করা সম্ভব বলে বিশেষজ্ঞ মহলের অভিমত।

মানুষ তার লোভ কিংবা মুনাফার টানে নদীর শুধু গতিপথই বদলে দিচ্ছে না, আঘাত করছে নদীগুলোর প্রাণবৈচিত্র্যেও। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বংশী, বালু, লৌহজঙ্গ কিংবা শীতলক্ষ্যার মতো নদীগুলোর দু’ধারে যে শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে, তার অপরিশোধিত বর্জ্য গিয়ে পড়ছে এসব নদীতে। ফলে বিষক্রিয়ায় মরে যাচ্ছে নদীর প্রাণ। শীতলক্ষ্যা অলরেডি মারা গিয়েছে।

তথ্যসূত্রে শীতলক্ষ্যার পানি অসম্ভব দুর্গন্ধময়। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ এখন ন্যূনতম মাত্রার চেয়েও কম। গত ৫১ বছরে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় রাস্তাঘাটের মতো অবকাঠামো নির্মাণের মতো বিষয়তে যতখানি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সে তুলনায় নদনদীর উন্নয়নের দিকে নজর দেয়া হয়েছে কম। রাস্তাঘাট নির্মাণ করাটা রাজনৈতিক নেতাদের কাছে নদী খননের চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয়। কারণ রাস্তাঘাট, সেতু, কালভার্ট ইত্যাদি নির্মাণ করলে তা খালি চোখে দেখা যায়।

কিন্তু নদী খনন করলে তা খালি চোখে দেখা যায় না। জনগণের বাহবাও পাওয়া যায় না। বাংলাদেশে নদীপ্রবাহে যে সর্বব্যাপী পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে, তার চিত্রটা এখনই ফুটে উঠতে শুরু করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞ এবং পরিবেশ বাদীরা। তারা বলছেন, নদী-রক্ষার প্রশ্নে এই মুহূর্তে পদক্ষেপ নেয়া শুরু না হলে, এক সময় মানচিত্র থেকে মুছে যাবে বহু নদীর নাম। নদীমাতৃক বাংলাদেশের উত্তর প্রজন্মকে নদী সম্পর্কে জানতে হবে জাদুঘর থেকে। কারণ পরিস্থিতি সেই বার্তাই দিচ্ছে।

বিগত ৬০-৭০ বছরেও অনেক নদী খনন না করায় নদীর তলদেশে পলি জমে এর নাব্য হ্রাস পেয়ে এককালের উত্তাল নদী ছন্দ হারিয়ে আজ মরা খালে পরিণত হচ্ছে। আর এতে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্যসহ মৎস্যসম্পদ ও নানা জলজপ্রাণী। হাজার হাজার জেলে পরিবার এখন তাদের আদি পেশা ছেড়ে বেকারত্ব ঘোচাতে বেছে নিয়েছে অন্য পেশা। খেয়া পারের মাঝিরা বৈঠা ছেড়ে কলের নৌকা চালিয়েও শেষ অবধি ছাড়তে হয়েছে বাপ-দাদার পেশা।

জালের মতো ছড়িয়ে থাকা শাখা নদীগুলোও এখন বিত্তবানদের ফসলি জমি। ভয়াবহ নাব্য সংকট নদীর অববাহিকায় পরিবেশ বিপর্যয়সহ কৃষি আবাদে নেমে এসেছে স্থবিরতা। নদীর তলদেশে পানি না থাকায় সেচনির্ভর কৃষকরা পড়েছে মহাসংকটে। বাংলাদেশে ছোট বড় অসংখ্য নদনদী জালের মতো ছড়িয়ে আছে। প্রাচীন কাল থেকেই বাংলার মানুষের জীবন ও জীবিকার অন্যতম অবলম্বন এ দেশের নদনদী। তবে নদী ভরাট, নাব্য হ্রাস ও দূষণের কারণে ছোট-বড় অনেক নদী বর্তমানে বিপন্ন। এক সময়ের বুড়িগঙ্গা নদী আজ হারাতে বসেছে।

ব্রহ্মপুত্র আর শীতলক্ষ্যার পানি এক স্রোতে মিশে বুড়িগঙ্গা নদীর সৃষ্টি হয়েছিল। বর্তমানে এটা ধলেশ্বরীর শাখা বিশেষ। বুড়িগঙ্গার সৌন্দর্য বাড়ানোর কাজ করেছিলেন বাংলার সুবাদার মুকাররম খাঁ। তার শাসনামলে শহরের যেসকল অংশ নদীর তীরে অবস্থিত ছিল, সেখানে প্রতিরাতে আলোকসজ্জা করা হতো। এছাড়া নদীর বুকে অংসখ্য নৌকাতে জ্বলত ফানুস বাতি।

তখন বুড়িগঙ্গার তীরে অপরূপ সৌন্দর্যের সৃষ্টি হতো। ১৮০০ সালে টেইলর বুড়িগঙ্গা নদী দেখে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন-বর্ষাকালে যখন বুড়িগঙ্গা পানিতে ভরপুর থাকে তখন দূর থেকে ঢাকাকে দেখায় ভেনিসের মতো। তবে বুড়িগঙ্গার আগের ঐতিহ্য এখন আর নেই। কালের বিবর্তনে দখল হয়ে যাচ্ছে বুড়িগঙ্গার নদীতীর। 
এই দখলদারের থাবা থেকে কোনভাবেই মুক্তি মিলছে না ইতিহাস-ঐতিহ্যে ভরপুর ঢাকার বুড়িগঙ্গাও। দিন দিন দখল হয়ে নালায় পরিণত হচ্ছে নদীটি। শুধু বুড়িগঙ্গা নয় অবৈধ দখলদারিত্ব আর দূষণে বিপন্ন হতে চলেছে তুরাগ নদী।

কালের পরিক্রমায় গতি হারাতে বসেছে তুরাগ। দখল-দূষণের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় অভিযান চললেও পরিত্রাণ মেলেনি তুরাগের। দূষণের অন্যতম কারণ হলো ব্যবসা। যারা ব্যবসা করেন তারা কেউই নিয়ম মানেন না। তারা নদী দূষণ করে অর্থ আয় করছে। আইন মেনে চললে তাদের ব্যবসা কম হতো। নদী বাঁচত। ব্যবসায়ীরা কোন সময়ই নদীর দিকে নজর দেন না। আর তাই নদীগুলোর বর্তমান যে অবস্থা তা ভয়াবহ। পরিবেশ বিদদের মতে, সিএস রেকর্ড ধরে সীমানা চিহ্নিত করে নদীগুলোকে বাঁচাতে হবে।

দূষণ শক্ত হাতে প্রতিরোধ করতে হবে। হাজার হাজার শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়া যাবে, কিন্তু একটি নদী সৃষ্টি করার সামর্থ্য কারও নেই; যা সৃষ্টি করা যায় না, তা ধ্বংস করা যাবে না।এই সত্যকে মাথায় রেখেই নদ নদীর সুরক্ষা ও সংরক্ষণে মনোযোগী হতে হবে।


লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক                                                                                        

raihan567@yahoo.com

লেখাটি দৈনিক করতোয়ায় প্রকাশিত