ছোট হয়ে আসছে চলনবিল, হুমকির মুখে জীববৈচিত্র্য-কৃষি


বিশেষ সংবাদ গুরুদাসপুর

বড়াইগ্রাম প্রতিনিধি

(১ ঘন্টা আগে) ২৭ জুলাই ২০২৬, সোমবার, ২:০৮ পূর্বাহ্ন

natoreview

ছোট হয়ে আসছে চলনবিল

মৎস্য ভাণ্ডার খ্যাত দেশের বৃহত্তম চলনবিল ক্রমেই হারাচ্ছে তার বিস্তৃতি ও প্রাণবৈচিত্র্য। অপরিকল্পিত উন্নয়ন, বাঁধ ও মহাসড়ক নির্মাণ, নদী-খালে পলি জমে নাব্য হ্রাস, জলপ্রবাহে বাধা এবং নির্বিচারে পুকুর খননের মতো মানবসৃষ্ট নানা কারণে বিলটির স্বাভাবিক জলপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে।

প্রতি বছর গড়ে ১ দশমিক ৮৩ বর্গকিলোমিটার করে কমছে চলনবিলের আয়তন। এতে দেশীয় মাছের প্রজনন, জলজ জীববৈচিত্র্য, কৃষি হুমকির মুখে পড়েছে। বিলনির্ভর লাখো মানুষের জীবিকায় সরাসরি প্রভাব পড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যকর সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত উন্নয়ন নিশ্চিত করা না গেলে চলনবিল ভবিষ্যতে আরও বড় অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।

এক সময় রাজশাহী বিভাগের ছয় জেলা নিয়ে গঠিত হলেও বর্তমানে নাটোর, পাবনা ও সিরাজগঞ্জের ১০টি উপজেলার ৬২টি ইউনিয়নের এক হাজার ৬শ গ্রাম নিয়ে এ চলনবিল।

ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়ার হিসাব মতে, ১৮২৭ সালে জনবসতি এলাকা বাদ দিয়ে চলনবিলের জলমগ্ন অংশের আয়তন ছিল এক হাজার ৪২৪ বর্গকিলোমিটার। ১৯৪০ সালের জরিপে চলনবিলের আয়তন দাঁড়ায় ৭০৫ বর্গকিলোমিটারে। তিন যুগে প্রায় ৩৫ শতাংশ কমে চলনবিলের আয়তন দাঁড়িয়েছে ৩৭৫ বর্গকিলোমিটারে। তবে বাংলাপিডিয়ার দেওয়া তথ্যমতে বর্তমানে চলনবিলের আয়তন মাত্র ১৬৮ বর্গ কিলোমিটার।

নাটোর বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, চলনবিলের ৪৭টি ছোট-বড় নদী রয়েছে। পলি জমে ভরাট এবং নাব্য সংকটের কারণে অনেক নদীই তার স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে। বর্ষা মৌসুমে আশপাশের বিভিন্ন পেশার মানুষ মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। তবে অবৈধ কারেন্ট জাল, ‘চায়না দুয়ারি’ ও ‘বাদাই’ জালের ব্যবহারের কারণে দিনে দিনে বিলুপ্তির মুখে এসব দেশীয় মাছ। ফলে এ পেশা ছেড়ে অনেক জেলে অন্য পেশায় চলে গেছেন।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ১৯১৪ সালে চলনবিলের ভিতর দিয়ে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের নির্মিত সিরাজগঞ্জ-ঈশ্বরদীর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ রেললাইনই চলনবিলের মধ্যে প্রথম উন্নয়ন কর্মকাণ্ড। এ রেললাইন স্থাপনের মধ্য দিয়ে চলনবিলকে প্রথমবারের মতো বিভাজিত করা হয়। ১৯৮০ সালে বাঘাবাড়ি-তাড়াশ বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ চলনবিলের পানিপ্রবাহ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত করে। এরপর ১৯৯৮ সালে ৫৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বনপাড়া- হাটিকুমরুল মহাসড়ক নির্মাণ কাজ শুরু হলে এটির বড় প্রভাব পড়ে চলনবিলের ওপর।

১৯৯৫-৯৬ থেকে ২০০৯-১০ অর্থবছর পর্যন্ত সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এ সময়ে চলনবিলে এক হাজার ১৮৮ কিলোমিটার পাকা সড়ক, ১১৩টি সেতু, ৮৫৫টি কালভার্ট, ৯০টি গ্রোথ সেন্টার ও ২১টি স্লুইসগেট নির্মাণ হয়েছে। চলনবিলের ভেতর ১৫টি পোল্ডার সৃষ্টি করতে গিয়ে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। পানির গতিপথ বন্ধ করে সিংড়া শেরকোল এলাকায় ১৫ একর জমির ওপর নির্মাণ করা হয় হাইটেক পার্ক এবং আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার। ফলে হাজার হাজার বিঘা জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। চলনবিলের বুক চিরে নির্মাণ করা হয়েছে অসংখ্য উঁচু ঢালাই রাস্তা।

অন্যদিকে পুকুর খনন করে পানিপ্রবাহ বন্ধ করা হয়েছে। মাত্র ১২ বছরের ব্যবধানে বিস্তীর্ণ চলনবিলে অন্তত ৮ থেকে ১০ হাজার পুকুর খনন করা হয়েছে। ফলে পানির গতিপথ নষ্ট হয়েছে। কমছে বিলের আয়তন।

বিভিন্ন গবেষকদের মতে, ব্রহ্মপুত্র নদ যখন তার প্রবাহপথ পরিবর্তন করে বর্তমান যমুনায় রূপ নেয়, তখনই চলনবিলের সৃষ্টি।

ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়ার হিসাব মতে, ১৮২৭ সালে জনবসতি এলাকা বাদ দিয়ে চলনবিলের জলমগ্ন অংশের আয়তন ছিল ১ হাজার ৪২৪ বর্গকিলোমিটার। ১৯৪০ সালের এক জরিপে চলনবিলের আয়তন দাঁড়ায় ৭০৫ বর্গকিলোমিটারে। বর্তমানে চলনবিলের আয়তন কমে দাঁড়িয়েছে ৩৬৮ বর্গকিলোমিটারে। প্রতি বছর গড়ে ১ দশমিক ৮৩ বর্গকিলোমিটার আয়তন কমছে চলনবিলের।

কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) পানাসি প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, চলনবিলের পাবনা, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ অংশে ২১টি নদ-নদীর অধিকাংশই এখন ভরাটের দিকে। বর্তমানে মরা খালে পরিণত হয়েছে বড়াল নদ। বিলে ৭১টি খাল ও নালা রয়েছে, যার দৈর্ঘ্য ৪১০ কিলোমিটার। কৃষকরা এসব খাল ও নালা থেকে ফসল উৎপাদনে সেচের পানি পেতেন।

চলনবিল রক্ষা আন্দোলনের সদস্য সচিব মিজানুর রহমান জানান, অপরিকল্পিত বাঁধ ও উন্নয়ন, জলাভূমি ভরাট, পলি জমে নাব্য হ্রাসে চলনবিলের আয়তন দিন দিন কমছে। সরকারের উচিত, চলনবিলকে বাঁচিয়ে উন্নয়নের পরিকল্পনা করা।

নাটোর বিএডিসির নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, চলনবিলের ভেতরে অপরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের ফলে দিনে দিনে কমছে চলনবিলের পরিধি। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তন যেমন- অসময়ে বৃষ্টিপাত, নদ-নদীর নাব্য কমে যাওয়া, অপরিকল্পিতভাবে খালের মুখে বাঁধ দেওয়া ও পলি পড়ে ভরাট হওয়ায় চলনবিল তার গৌরব হারিয়েছে।