সাপ্তাহিক চলনবিল প্রবাহের সম্পাদক মাহমুদুল হক খোকন এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে গ্রামীণ আবহ তুলে ধরেছেন,
নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার চলনবিল অধ্যুষিত কচুগাড়ী গ্রাম। এ গ্রামের নতুন পাড়ার দরিদ্র কৃষক ছায়মদ্দির বউ রোকেয়া। পাড়ার লোকে তাকে ববিতার মা বলেই ডাকে। ছায়মদ্দি সারাদিন মাঠে কাজ করে মাত্র বাড়ি ফিরেছে। রোজার মাসে সেহেরি –ইফতারি ও রান্না নিয়ে তার স্ত্রীর সাথে তার কথোপকথনঃ
ছায়মদ্দিঃ (চরা থেকে ফিরে ) এ ববিতার মা কোতি গেলু রে। কখন থ্যাকি তোক ডাক পারতিচি। চুরাত থ্যাকি মাতাত কইরি বুজা ট্যানি আনি হাপসি ল্যাগি গ্যাচে। ইসতিরের সুমায় পুরায় হয়্যা আইল। তোর রাদা বাড়াই একোনো হলোল্যা। কখন কি করবুনি। ববিতা কোইত গ্যাচে। ডাক দি একটু হাতে পাতে রাদা বাড়া স্যারি লে।
https://www.facebook.com/photo/?fbid=10217957975540716&set=pcb.10217957981140856
ববিতার মাঃ এতো ডাক পারতিচ্যাও ক্যা। দেকতিচ্যাওনা আমি আকাত ভাত তুলি দিচি। সারাদিন ধরি বাড়ির কাম করিতিচি। তাও কি কাম ফুরায়। মিয়িডাক কনু কুনোঠে যাস না। সুন্দার সুমায় ইকটু ইডা উডা গুছা দিস। কুন পাড়া মুল্লুকে গ্যাচে তার ঠিক নাই। সাড়া পারা উটকি আনু। কুনো ঠে যদি পাই। আজ আসুক। মাসের আজ কয় দিন অক ভালো করি বুজি দিবোনি।
ছায়মদ্দিঃ লে আর খ্যাচ খ্যাচ করিস না। রুজা রুমজানের দিন এত পুচাল পারিস না। ইকটু পরে মুল্লা আজান দিবি । ইসতিরের সুমায় হতে আর বেশি দেরি নাই। মুড়ির টিনে থ্যাকি চ্যাড্ডি মুডি বা’র কর। ধুরাবাশশি হাটে থিনি ক্যালকি এক পোয়া ছুলা কিনি আনিচুনু , তা আচে না শ্যাষ হয়া গ্যাচে।
ববিতার মাঃ ছুলা ইকটু আচে। জ্বাল না দিলে ওতা খাওয়া যাবি নানি। ক্যালকি হাটেত থিনি আনিচ্যাও, ওই ছোলা কি ভালো থাকে। একটু গুন্দানি গুন্দানি হইচে। রকো, ইকটু আকাত থিনি জ্বাল দি লি আসি।
ছায়মদ্দিঃ আজ যে গরম পড়িচে। এক ফূটা বাতাস কুনো ঠে নাই। রুজা আজ ধরি গ্যাচে। সেইরোম পানি তিষি লাইচে। মুনে হচ্ছে ম্যাটি কলসির এক কলসি পানি খ্যায়া ফেলাব। শুনেক , ইকটু কুশিলের গুড়ের শরপত বানা। মুঙ্গলবার চাঁচকোড় হাটেত থিনি একসের কুশিলের গুড় আনিচুনু। গুড়্গুনির সেই রম দানা আচিলো।
ববিতার মাঃ (ববিতাকে উদ্দেশ্য করে) ওই দ্যাকো সারা পাড়া সফর করি একোন ইসতিরের সুমায় আসল। আসার কি কাম আচিলো। ওততোরেই থাকতে পারলুল্যা। কুনঠে গেচুলু এ শয়তান। কামের সুমায় হাতের কাছে তোক পাওয়া যায় না। তাড়াতাড়ি তোর বাপেক এক গিলাস শরপত বানা দে। শপ প্যারি ঘরে থ্যাকি থাল, করচুল, বাটি লি আয়। আজান দিলো বুলি। ইসতির লিয়া লাগিবিল্যা ।
ছায়মদ্দিঃ এ ববিতার মা , সাঝ রাতের ল্যাগি বেশি কিচু রাদা লাগবিল্যা। ইসতির লি বেশি কিচু খাওয়া যায় না। এ রাতে স্যাজনি আর ডাঁটার ঝোল দি চ্যাড্ডি ভাত খাবোনি। পরভাতের জন্য টিংরা মাছ আর আলু দি থকথকি করিস। আর কচুগাড়ী বাজার থিনি যে ছোট মিশিলি মাছ আনিচুনু ওইতা একটু মাকানি মাকানি করি রাদিস। এই বারের রুজার যে দিন পড়িচে ভালোমুন্দ না খ্যালে রুজা রাকাই কঠিন। দিনের বিলা যে গরম আর ঝাওয়াল উটে গুলা মুনে হয় শুকি কাট হয়া যায়।
ববিতার মাঃ আচ্চা, তাই রাদবোনি। শাকিলের মা আজ গুডাদি লাতারি পাতারি শাগ দিচিলো। শাগ গুনিও ভ্যাজবো। শুকনি মিরিজ দি ডোইলি খাইলে সেইরোম সদ লাগে। ইবার তো খুড়ির শাগ দিকাই যাচ্চে না।
ছায়মদ্দিঃ এ ববিতা , শরপতের গিলাসডা ইকটু আগি দে তো। মুল্লা মরজিদে আজান দিচ্চে। ইসতির লি মরজিদে নামাজ পড়তে যাবো। সগগোলি বসি ইসতির লে।
..........................................................................................
শব্দ বিশ্লেষণঃ কোতি- কোথায়, চুড়াত- চড়া বা মাঠ , মাতাত- মাথায় , বুজা ট্যানি- বোঝা টেনে, হাপসি- ক্লান্ত , ইসতিরের সুমায়- ইফতারের সময়, পুরায় হয়্যা আইল- প্রায় হয়ে এলো , রাদা বাড়াই- রান্না বান্নাই , কোইত গ্যাচে- কোথায় গেছে , হাতে পাতে-হাতে হাত মিলিয়ে , স্যারি লে- শেষ করে নে ,আকাত- চুলায় , মিয়িডাক কনু-মেয়েটাকে বললাম , কুনো ঠে- কোন জায়গায় , সুন্দার সুমায়- সাঝের বেলা, ইডা উডা- এটা সেটা, কুন-কিন্তু , উটকি আনু- খুঁজে এলাম, কুনো ঠে- কোনো জায়গায় , অক- ওকে , বুজি দিবোনি- বুঝিয়ে দিবো, খ্যাচ খ্যাচ- বেশি কথা বলা বা ঝগড়া করা , পুচাল-প্যাচাল বা বেশি কথা বলা , মুল্লা- মোল্লা , ধুরাবাশশি হাটে থিনি- ধারাবারিষা হাট থেকে , গুন্দানি গুন্দানি- গন্ধ গন্ধ ভাব , রকো- দাঁড়াও , পানি তিষি লাইচে- পানি পিপাসা লেগেছে, ম্যাটি কলসির –মাটির কলসি, শরপত- শরবত , ওততোরেই- ও দিকেই , কুনঠে গেচুলু- কোথায় গিয়েছিলু , শপ প্যারি- মাদুর বিছিয়ে , করচুল- চামচ , স্যাজনি আর ডাঁটার- তরকারি বিশেষ , পরভাতের- প্রভাতে বা শেষ রাতে, থকথকি- কম ঝোল দিয়ে রান্না করা , মাকানি মাকানি করি- ঝোল শুকিয়ে রান্না করা , ঝাওয়াল – গরম বাতাস , রাদিস- রান্না করিস, গুলা- গলা বা কন্ঠ , র্যা দবোনি- রান্না করব, গুডাদি- অল্প , লাতারি পাতারি শাগ-বিভিন্ন ধরনের মিশানো শাক, সদ-স্বাদ ,গিলাসডা- গ্লাসটা , মুল্লা মরজিদে- মোল্লা মসজিদে , সগগোলি বসি ইসতির লে- সবাই বসে ইফতার নাও।
