“আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন-
আমারে দুদন্ড শান্তি দিয়েছিল নাটোরের বনলতা সেন।”
নাটোরের ইতহাসে বনলতা নামটি ওতোপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে আজ অব্দি। রুপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাস যাকে সৃষ্টি করেছিলেন অপূর্ব কাব্যিক মাদুর্য্য মিশিয়ে। সৌন্দর্যের ভুবনবিখ্যাত উপমার বর্ণনায় বনলতা সেন কে প্রশংসায় অভিষিক্ত করেছেন তার কবিতায়। সেই সাথে নাটোরকে করেছেন আলোচিত, আলোড়িত।
কাঁচা গোল্লার দেশ নাটোর, ইতিহাস বিখ্যাত চলনবিলের দেশ নাটোর, রাণী ভবানীর দেশ নাটোর। স্বপ্ন, নাকি বাস্তব তর্ক-বিতর্কের বনলতার সৌন্দর্য রুপসী বাংলার কবিকে কতটুকু শান্তি দিয়েছিল তা জানিনা, তবে আমাদের নাটোর ভ্রমণে শান্তি ছিল পুরোদমে। স্মৃতির পাতায় স্মরণীয় একটি দিন। মেধাবিকাশে আড্ডার ফাঁকে আমাদের প্রিয় মোস্তফা স্যারকে ভ্রমণের প্রস্তাব দিলে স্যার সানন্দে রাজী হয়ে সদস্য সংগ্রহ পুর্বক একটি ভ্রমণসূচী তৈরি করতে বলেন। সেই মোতাবেক নাটোর ভ্রমণের একটি সূচী এবং আমাদের ৯ সদস্যের একটি তালিকা স্যারের কাছে প্রদান করি।
সফরসঙ্গী- মাহমুদুল হাসান (রামেক), আশিফ করিম (ঢাবি), মজনু আলম (ঢাবি), রিপন সরকার (চবি), ফরুক হোসেন (বাকৃবি), খাইরুল আলম (রাবি), রায়হান (ঢাবি), পলাশ (ঢাবি), শাহীন ইসলাম (দ্বাদশ)।
১১ জুলাই ২০১৬ইং গোলাম মোস্তফা স্যারের নেতৃত্বে খুবজীপুর হতে নাটোর অভিমুখে যাত্রা। সকাল ৯ টায় নাটোর চিনিকলো গেটে পৌঁছে যাই। সকালের নাস্তা শুরু করতেই মিজান নামে এক ভদ্রলোক আমাদের রিসিভ করে নিয়ে যান। শুরু হলো ঘুরে দেখা। দুঃখের বিষয় সেই মূহুর্তে চিনি উৎপাদনের মৌসুম ছিলোনা। তাই সরাসরি চিনি তৈরি দেকার সুযোগ হয়নি। চিনিকলের বিশাল বিশাল যন্ত্রাংশ দেকে মনে হয়েছে বিস্ময়কর যন্ত্রদানব। মিজান সাহেব জানালেন চিনিকলে আখ মাড়াই শুরু হয় নভেম্বর মাস থেকে জানুয়ারী, ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত এবং চিনি উৎপাদনের পরিমান ৬-৭ হাজার মেট্রিকটন। মিজান আংকেলের চা কেয়ে চিনিকল থেকে বিদায় নিয়ে পথ ধরলাম প্রান কোম্পানির। আমরা যখন প্রান কোম্পানির প্রধান ফটকে ঘড়িতে তখন সময় প্রায় ১১.৩০টা। স্যার অফিসিয়াল কিছু কাজ সারার পর পরই প্রাণ কোম্পানীতে কর্মরত এক ভদ্রলোক আমাদের রিসিভ করে কনফারেন্স রুমে বসার ব্যবস্থা করেন। কিচুক্ষণ পর প্রাণ কোম্পানির ডিজিএম হযরত আলীর নেতৃত্বে একদল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আমাদের সাথে যোগ দেন। শুরুতেই ডিজিএম মহোদয় কোম্পানির প্রতিষ্ঠাকাল, উৎপাদিত পণ্য, এবং এর বাজারজাত ব্যবস্থা সস্পর্কে ধারনা দেন এবং বর্ণনার ফাঁকে ফাঁকে জুস এবং চিপস্ দিয়ে আপ্যায়িত করেন। অতঃপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যঅলয় হতে পাশকৃত এক প্রাণবন্ত কর্মকর্তা আকরামুল ইসলাম (আমি) কে গাইড হিসেবে নিযুক্ত করেন। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে প্রান এ্যাগ্রো লিমিটেড গুরে দেখান। আইসপপ ড্রিংকস, ফ্রুটো লিচি, মি: নুডুলস, চকোবিন টফি এবং বিভিন্ন প্রকার মসলা উৎপাদন প্রক্রিয়অ প্রত্যক্ষ করলাম। লক্ষণীয় বিষয় কোম্পানিতে নিযুক্ত অধিকাংশ কর্মীই নারী। উৎপাদনের পরিবেশ খুবই সন্তোষজনক। প্রতিটি স্তরে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্যকর বিষয় নিশ্চিত করছে। তাদের উৎপাদিত পণ্য বিশ্বের ১২০টি দেশে রপ্তানি হয়। ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানিতে কর্মরত কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৭০০০ (সাত হাজার)। উৎপাদিত পণ্য সংখ্যা প্রান এ্যাগ্রো লিমিটেড এবং নাটোর এ্যাগ্রো লিমিটেডে যথাক্রমে ৯ এবং ৪ । তাদের সুপরিসর ল্যাবরেটরী ঘুরে দেখি। ল্যাবের একজন কর্মকর্তা উৎপাদিত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন প্রক্রিয়া আমাদের ব্যাখ্যা করেন। সময়ের অভাবে নাটোর এ্যাগ্রো লিমিটেড না দেখেই ডিজিএম মহোদয়ের অনুরোধে আবার কনফারেন্স রুমে ফিরে যাই। এখানে স্যার মজনু আলম ভাইকে গুরে দেখার অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করার নির্দেশ দেন। সবশেষে স্যার প্রাণ কোম্পানির ডিজিএম সহ অন্যান্য কর্মকর্তাকে ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বিদায় নেন। ক্ষুধার রাজ্যে প্রথিবী গদ্যময় হয়ে ওঠার আগেই মধ্যাহ্নভোজের জন্য রওনা হলাম নাটোরের বিখ্যাত ইসলামীয়া (পচুর) হোটেল। ভোজ শেষে গাড়ি চলল উত্তরা গণভবনের উদ্দেশ্যে। গড়ির কাটায় বেলা তখন ৩.৩০ প্রায়। জনাব, মো. সাইদুর রহমান (যুগ্ম সচিব) স্যার এডিসি জেনারেল কে বলে রাখায় উজ্জল নামের ভদ্রলোক আমাদের রিসিভ করে ভিতরে নিয়ে যান। আমরা রুমের ভিতর গিয়ে রাজসিংহাসন, বিশাল সভাকক্ষ, ডাইনিং রুম, খাট পালঙ্কসহ রাজাদের ব্যবহৃত অনেক জিনিস দেখার সুযোগ পেলাম। পাশেই রাণীর ইতালিয়ান গার্ডেন ঘুরে দেখলাম। বাগানের প্রায় অধিকাংশ গাছই নাকি ইতালি থেকে নিয়ে আসা তাই এর নাম ইতালিয়ান গার্ডেন। পাশ দিয়ে রয়েছে নয়নাভিরাম লেক। তারপর কুমার প্যালেসে দাড়িয়ে নির্মল বায়ু উপভোগ সাথে কিছু খুনসুটি। রাজা দয়ারাম নির্মিত উত্তরা গণভবন যেন, ছবির মত সুন্দর। প্রধান ফটক এবং ভিতরের দৃষ্টিনন্দন ভবনগুলো প্রাচীন স্থাপত্য শিল্পের অতুলনীয় নিদর্শন। উত্তরা গণভবন পরিদর্শন শেষে স্যার জানালেন বিকেল ৫টায় এডিসি (রাজস্ব) মহোদয় উত্তরা গণভবনের উপর পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশণ দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। যুগ্ম সচিব সাইদুর রহমান স্যার গোলাম মোস্তফা স্যারকে পূর্বেই এটি অবহিত করেছিলেন। যথাসময়ে আমরা ডিসি মহোদয়ের কনফারেন্স রুমে প্রবেশ করি। এডিসি (রাজস্ব) মহোদয় আনুষ্ঠানিক পরিচয় পর্ব দিয়ে শুরু করেন এবং আমাদের কে সঠিক পথে পরিচালিত হয়ে আগামী দিনে আলোকিত মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার উপদেশ দেন।
উল্লেখ্য সেখানে আরও দুইজন নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট উপস্থিত ছিলেন। আলোচনার ফাঁকে পেয়ারা, মিষ্টি, চানাচুর, এবং চা দিয়ে আমাদের আপ্যায়ন করেন। আরৈাচনার এক পর্যায়ে গোলাম মোস্তফা স্যার বিশিষ্ট সমাজকর্মী শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদ ও তাঁর সৃষ্টিকর্ম, ডা. খলিলুর রহমান ও মেধাবিকাশ ফাউন্ডেশন এর কার্যক্রম, মাননীয় এমপি মহোদয়ের নির্মিত মা-জননী সেতু এবং বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। তাছাড়া এলকার সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে সৌহার্দ ও সম্প্রীতির যে নিবিড় বন্ধন রয়েছে সে বিষয়ে আলোকপাত শেষে সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা এবং এডিসি, এনডিসি ও অপর দু’জন নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেটকে চলনবিল ভ্রমণের আমন্ত্রণ জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন।
এডিসি (রাজস্ব) মহোদয় রাণী ভবানী রাজবাড়ী আমাদের দেখানোর জন্য সেখানের দায়িত্বরত কর্মচারীদের টেলিফোনে বলে দেন। রাজবাড়ী যাবার পথে ভাগ্য সূপ্রসন্ন তাই পথ ভুলে চলে যাই কালিমন্দিরে, সেখানে তৈরি হয় নাটোরের বিখ্যাত কাঁচাগোল্লা। সুযোগটা হাতছাড়া না করে গরম গরম কাঁচাগোল্লা কিনে খেয়ে নিলাম পরম তৃপ্তিতে। গোধূলীলগ্নে ঘুরে দেখলাম অর্ধবঙ্গেশ্বরী মহারানী ভবানীর স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক রাজবাড়ী। পরিদর্শন শেষে মনে হলো প্রতিটি ভবনই বিদায়ের দ্বার প্রান্তে শেষ চিহ্ন টুকু মুছে ফেলার অপেক্ষায়্ মাগরিবের আযান শেষে নামাজ পরে রওনা হলাম মোস্তফা স্যারের ছাত্র যমুনা ব্যাংকে কর্মরত মিজান ভাইয়ের কর্মস্থলে। হঠাৎ পেয়ে গেলাম এ্যাডভোকেট লোকমান হোসেন কে। তিনি পুনরায় আমাদের পচুর হোটেলে আলুর চপ এবং দই খাওয়ালেন। শেষে মিজান ভাইয়ের সঙ্গে তার বাসায় গেলাম। তিনি হরেক রকম নাস্তাযোগে আমাদের আপ্যায়িত করলেন। পরিশেসে বিদায় নিয়ে রওনা হলাম আপন গন্তব্যে। রাত প্রায় ১০ টা চলনবিলের বুকচিরে নির্মিত স্বপ্নের মা জননী সেতুতে নেমে নির্বিগ্নে নাটোর ভ্রমণ সমাপ্ত হওয়ায় মহান স্রষ্টার প্রতি অশেষ শুকরিয়া।
অর্থে সন্ধানে নয়- নয় বিত্তের সন্ধানে বাল লাগার এক দুরন্ত বাসনায় কাটনো স্বর্নালী সকাল, ক্লান্ত দুপুর, পড়ন্ত বিকেল ও গোধূলীলগ্ন সবকিছুই দুর্লভ ও অম্লান স্মৃতি হয়ে থেকে যাবে আমাদের মনের মণিকোঠায়।
নাটোর চিকিল পরিদর্শনে এ্যাড. লোকমান হোসেন, এ্যাড. আব্দুল ওয়াহাব, প্রাণ কোম্পানিতে জনবা মো. আব্দুল মান্নান (হেড অব হিউম্যান রিসোর্সেস, ফেডেক্স), উত্তরা গণভবন ও রাণী ভবানী রাজবাড়ী পরিদর্শনে জনাব মো. সাইদুর রহমান (যুগ্মসচিব, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ) প্রমুখের সহযোগিতায় এবং সকলের সাথে মোস্তফা স্যারের নিপুন সমন্বয় সাধন এই ভ্রমণ কে করে তোলে আকর্ষণীয় ও আনন্দদায়ক- আমরা এই মানুষদের প্রতি জানাই অশেষ শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞাতা।
বিশেষ কৃতজ্ঞাতা: ডা. খলিলুর রহমান কে যার ফাউন্ডেশন আমাদের একসুতায় আবদ্ধ করেছে।
