ছোট বেলায় ক্লাস থ্রি র টেক্সটবুকে পড়েছিলাম “নাটোর ঘুরে এলাম”। এটা ছিল নাটোরের দিঘাপতিয়া রাজবাড়ি তথা উত্তরা গণভবন নিয়ে একটা চমৎকার পরিচিতি। এরপর সেই নাটোরের চিত্র ধরা পড়েছে বিভিন্ন ভাবে। কাঁচাগোল্লা আর জীবনানন্দ দাসের বিখ্যাত বনলতা সেন কবিতায় নাটোর পেয়েছে এক ভিন্ন পরিচিতি।সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে পরিচিতির পরিধি যেন বেড়েই চলেছে। নাটোরের হালতি বিল এখন ‘মিনি কক্সবাজার’ নামেই পরিচিত। ‘মিনি কক্সবাজার’ শুনে একটু অবাক হলেন তাই না! আসলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সমুদ্র সৈকতের মত শো শো বাতাস আর ছলাৎ ছলাৎ ঢেউয়ের আছড়ে পড়া দেখলে কক্সবাজারের সৈকতই মনে হবে। রাস্তার দু’ধারে থৈ থৈ পানি, মাঝে পিচ ঢালা পথ। পথটি যেন পানিতে ভাসছে। পথের দু’ধারে সবুজ লতাপাতার সমাহার। দূরে ছোট ছোট গ্রামগুলো দেখতে অনেকটা দ্বীপের মতো। আর এই রাস্তাটি বিলের মাঝের গ্রামগুলোর মধ্যে গড়ে তুলেছে এক সেতুবন্ধন। এখানে দাঁড়িয়ে বিকেলের স্নিগ্ধ বাতাস, দোলায়িত ঢেউ, শেষ বিকেলের সূর্যাস্ত দেখতে অপূর্ব লাগে।
নাটোর, নওগাঁ ও রাজশাহী জেলার বিস্তৃত অংশ জুড়ে যে জলভূমি বর্ষা এবং বর্ষা পরবর্তী সময়ে দেখা যায় সেটাই বিখ্যাত হালতি বিল যা বর্ষায় কানায় কানায় পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে অপরূপ সৌন্দর্যয়ের পসরা সাজিয়ে বসে। নাটোরের নবগঠিত নলডাঙ্গা উপজেলার একপ্রান্তে প্রায় ৪০ হাজার একরের বিস্তির্ণ এলাকা জুড়ে এর অবস্থান। ব্রিটিশ সরকারের সময়ে এই বিলে ঝাঁকে ঝাঁকে বিরল প্রজাতির ‘হালতি’ পাখী বসতো বলেই এর নামকরণ করা হয়েছিল হালতি বিল। তখন ব্রিটিশ সরকারের লোকজন এই বিলে আসতেন সেই হালতি পাখী শিকারে আর দীর্ঘদিন পরে আবার এখন সবাই আসেন এই বিলের দৃষ্টিনন্দন দৃশ্য উপভোগ করতে। ২০০৪ সালে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ পাটুল থেকে খাজুরা পর্যন্ত ৭ কিলোমিটার সাব মারসেবল সড়ক নির্মাণ করে। এই সড়ক নির্মাণের পর থেকে এক নয়নাভিরাম দৃশ্যের সূচনা হয় অর্থাৎ হালতি বিলেই সমুদ্র সৈকতের আমেজ সৃষ্টি হয় আর এই আমেজ নিতেই দূর-দুরান্ত থেকে মানুষের আনাগোনা বেড়ে যায়। কারণ, সময় ও অর্থের অভাবে অনেকের পক্ষে কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত দেখতে যাওয়া সম্ভব হয় না তাই অতি স্বল্পখরচে হালতি বিলেই সমুদ্র সৈকতের আমেজ নিতে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করে।
ঈদের পরের দিন ‘মিনি কক্সবাজার’ খ্যাত পাটুলে গিয়ে দেখি হাজার হাজার মানুষ। ছোট বড় নৌকাগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। সৈকতের মত এখানেও দর্শনার্থীরা গোছলের জন্য পানিতে নেমেছে। গভীরতা বেশী হওয়ায় পানিতে তলিয়ে যাওয়া পিচ ঢালা রাস্তায় সবাই দাঁড়িয়ে গোসল করছে। বিলে বেড়ানোর জন্য স্থানীয় নৌকা পাওয়া যায় ভাড়ায়। পাটুল থেকে খাজুরা, চানপুর বাজার পর্যন্ত নৌকা ভাড়া ২৫ থেকে ৩০ টাকা জন প্রতি। আবার পুরো বিল ঘুরে দেখার জন্য নৌকা রিজার্ভ ভাড়া পাওয়া যায়। সারাদিনের জন্য ভালো মানের একটি নৌকার ভাড়া পড়বে ৫শ’ টাকা থেকে ৬শ’ টাকা। ইঞ্জিন নৌকা মিলবে এক হাজার টাকা থেকে ২ হাজার টাকায়। এছাড়া ব্যক্তি মালিকানায় বাড়তি যোগ হয়েছে স্পিড বোট। হালতি বিলে পাটুল থেকে খোলাবাড়িয়া অথবা হালতি ও দিঘিরপাড় গ্রামে যেতে স্পিড বোটে জন প্রতি ভাড়া নিচ্ছে মাত্র ৫০ টাকা। প্রতি বোটে ১০ জন করে মানুষ এক সঙ্গে ঊঠতে পারে। বর্তমানে হালতি বিল পর্যটন এলাকা হিসেবেই পরিচিতি লাভ করেছে। এসবকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিনোদন স্পট। প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পর্যটকরা আসছেন পরিবার-পরিজন নিয়ে। সহজেই নৌভ্রমণ আর ডুবা সড়কের ওপর পায়ে হেঁটে আনন্দ উপভোগ করছে দর্শনার্থীরা। শুধু কি তাই স্বপ্নের সাধটুকু মেটাতে নৌকায় চড়ে বিলের এপার থেকে ওপার এবং ওপার থেকে এপারে আসছে, করছে আনন্দ উল্লাস।
জনসমাগম দেখে পাটুল বটতলায় স্থানীয়ভাবে ব্যক্তিগত উদ্যোগে বসানো হয়েছে বেশ কিছু দোকান-পাট ও মটর সাইকেল গ্যারেজ। শত শত মানুষের ঢল নামায় সেখানে হকারদেরও ভিড় বেড়েছে। মুড়ি, বাদাম, চানাচুর, ফল-মুল, চা-বিস্কুট, চকলেট, পান-সিগারেট এমনকি চুড়ি-মালা আর কসমেটিক্সের পসরা সাজিয়ে বসেছে অনেকে। বিক্রিও হচ্ছে বেশ। অপরদিকে শহরের কর্মব্যস্ত মানুষ হালতি বিলের অপূর্ব নৈসর্গিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে কাজের অবসর সময়কে বেছে নিচ্ছেন। পরিবার পরিজন নিয়ে তারাও বেরিয়ে পড়ছেন। এই পরিবেশ শহর আর গ্রামকে করেছে একাকার। এত কিছুর পরও এখানে কোন টয়লেট সুবিধা নেই। নেই কোন ভালো মানের রেস্টুরেন্ট। ঘাটে বসে থাকারও তেমন কোন ব্যবস্থা নেই। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন থেকে পাটুল ঘাট এবং হালতির বিল এলাকায় আইন শৃংখলা রক্ষায় পুলিশ নিয়োজিত করেছে। মাঝে মাঝে র্যাবের টহল দেখা যায়।
কিভাবে যাবেনঃ নাটোর শহরের প্রাণকেন্দ্র নিচাবাজারের ছায়াবানি সিনেমা হলের পাশের গলি অথবা পুরাতন বাসস্ট্যান্ডের কাছে অবস্থিত র্যাব অফিসের সামনে থেকে ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সা এবং সিনএনজি পাটুল পর্যন্ত যায়। অটোরিক্সায় জন প্রতি ভাড়া ২০ টাকা আর সিনএনজিতে জন প্রতি ভাড়া ২৫ টাকা। তবে দিন শেষে সন্ধায় নাটোর শহরে ফিরতে ভাড়া একটু বেশি ই লাগবে। জন প্রতি ভাড়া লাগবে ৪০ থেকে ৫০ টাকা।
কোথায় থাকবেনঃ শহরে অনেকগুলো আবাসিক হোটেল আছে। রুখসানা হোটেল, হাসিনা হোটেল, ভিআইপি হোটেল উল্লেখযোগ্য। তবে শহরের প্রাণকেন্দ্র নিচাবাজারে আছে নাটোর বোডিং। আশেপাশে খাবারের হোটেলও আছে।
সতর্কতা: সাঁতার না জানলে গোসল করার সময় পিচ ঢালা রাস্তা থেকে বেশি গভীরে যাবেন না। সিগারেট অথবা খাবারের প্যাকেট, পানির বোতল অথবা যেকোনো প্রকার ময়লা যেখানে সেখানে ফেলবেন না। পাখি মারা থেকে বিরত থাকুন। যার তার সামনে ধূমপান থেকে বিরত থাকুন। দোকানদার, নৌকাচালকসহ সবার সঙ্গে মার্জিত ব্যবহার করুন। ভুলেও এদের ছোট করে দেখবেন না। খেয়াল রাখুন নিজের কোনো আচরণের দ্বারা কোনো মেয়ে বিরক্ত হলো কি না। নৌকা ভ্রমণের সময় নৌকার ছাদে বসা থেকে বিরত থাকুন। বিলের মাঝখানে বিদ্যুতের তারে যে কোন সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
https://m.priyo.com/i/trip-to-patul-20170907
