লালপুরে রামকৃষ্ণপুর গোসাঁইজির আশ্রম। ছবি : নাটোরভিউ২৪
লালপুরের দুড়দুড়িয়া ইউনিয়নের রামকৃষ্ণপুর গোসাঁইজির আশ্রম কমিটি বিরোধে উভয়পক্ষ আদালতে মামলা করাসহ হামলা-পালটাহামলা এবং গোলাগোলির মতো ঘটনা ঘটেছে। ফলে ঐতিহ্যবাহী ফকির চাঁদ বৈষ্ণব গোঁসাইয়ের সৎসঙ্গ সেবাশ্রম মন্দিরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে। উপজেলার পদ্মা নদী ঘেঁষা ৩২৮ বছরের পুরনো এ আশ্রমকে ঘিরে ধর্মীয় সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে স্থানীয় হিন্দু ধর্মালম্বীদের মাঝে। মনোরম, শান্ত, নিভৃত পরিবেশে ফকির চাঁদ বৈষ্ণব গোসাঁইয়ের সমাধি মঠসহ নানা নান্দনিক স্থাপনা মন কাড়ে দর্শনার্থীদের। ধর্মীয় বিশ্বাস ও নানা কাহিনীতে আশ্রমটির খ্যাতি রয়েছে দেশজুড়ে। আশ্রমের কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে কমিটির মধ্যে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৯ মার্চ রাত ৯টার দিকে রামকৃষ্ণপুর প্রাইমারি স্কুলের সামনে উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয়ের ওপর হামলা হয়। এ ঘটনায় উত্তমসহ তার বাহিনীর বিরুদ্ধে মামলা করেন সঞ্জয়। সে মামলার প্রধান আসামি উত্তম কুমার দুড়দুড়িয়া হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক পদে আট মাস অনুপস্থিতি থাকার কারণে তাকে তিনবার শোকজ করলে তিনি কোনো উত্তর দেননি বলে জানিয়েছেন অধ্যক্ষ আব্দুল জব্বার। পরবর্তীতে গত ২০ মে আশ্রমের আমবাগান দখল নিয়ে আশ্রমে গোলাগুলি হয়। এতে উত্তম কুমারকে প্রধান আসামি করে ১৮ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করে আশ্রম কমিটি। গত ২১ নভেম্বর আশ্রম কমিটির একাংশের সভাপতি সঞ্জয় কুমারের নেতৃত্বে নবান্ন উৎসব পালন করা হয়।
অন্যদিকে অন্য অংশের সভাপতি উত্তম কুমারের দায়ের করা মামলা এবং আশ্রম পরিচালনা কমিটি সূত্রে জানা যায়, আশ্রমের নামে প্রায় ৬৫ বিঘা সম্পত্তি রয়েছে। যার মধ্যে আবাদি জমি প্রায় ৩০ বিঘা এবং চারটি পুকুর ২৫ বিঘা ও ১০ বিঘার আমবাগান রয়েছে, যা লিজ দেওয়া হয়েছে। বর্তমান কমিটির অভিযোগ, গত ১২ বছরে আশ্রমের প্রায় ২৫ বিঘা পুকুর প্রায় এক কোটি টাকা এবং প্রায় ৩০ বিঘা আবাদি জমি প্রায় ৪০ লাখ ও আমবাগান ১০ লাখ টাকায় লিজ প্রদান করেন আশ্রম পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি সঞ্জয় কর্মকার ও প্রধান সেবাইত চিমন্ত চন্দ্র রায় পরমানন্দ সাধু। সঞ্জয় কর্মকার সভাপতির পদে থাকাকালীন আশ্রমের কোনো সংস্কার এবং উন্নয়ন না করে বিভিন্ন সময় আশ্রমের আয়কৃত প্রায় দেড় কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। তারা আশ্রমের আয়কৃত অর্থ আশ্রমের ব্যাংক হিসাব নম্বরে জমা করেননি। এমনকি কোনো অডিট করানো হয়নি। এছাড়া দানবাক্স লুট, গাছ কর্তন ও বিক্রির সব অর্থই সঞ্জয় ও তার সহযোগীরা মিলে আত্মসাৎ করেছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, কর্তৃত্ব বজায় রাখতে নিয়ম বহির্ভূতভাবে কমিটির মেয়াদপূর্তির নির্ধারিত সময়ের সাত মাস পূর্বেই আরেকটি কমিটি গঠন করেন সঞ্জয় কর্মকার ও তার সহযোগীরা। বর্তমান আশ্রম পরিচালনা কমিটি হিসাব-নিকাশ চাইলে তা নানা কৌশলে এড়িয়ে যান সঞ্জয় কর্মকার। অজ্ঞাত কারণে সাবেক সভাপতি সঞ্জয়কে একতরফা সুবিধা দিয়ে যাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন। সর্বশেষ ১৬ নভেম্বর আশ্রম পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি সঞ্জয় কর্মকার ও প্রধান সেবাইত চিমন্ত চন্দ্র রায় পরমানন্দ সাধুর বিরুদ্ধে আদালতে প্রায় দেড় কোটি টাকা আত্মসাতের মামলা করেন বর্তমান কমিটির সভাপতি উত্তম কুমার মণ্ডল।
আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে লালপুর থানার ওসিকে মামলার তদন্ত করে ১৯ জানুয়ারি আদালত তাকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আশ্রম পরিচালনা কমিটির একাংশের সভাপতি উত্তম কুমার মণ্ডল জানান, সাবেক সভাপতি সঞ্জয় কর্মকার ও প্রধান সেবাইত চিমন্ত চন্দ্র রায় পরমানন্দ সাধু পরস্পর যোগসাজেশ করে আশ্রমের প্রায় দেড় কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তিনি আরও বলেন, ‘পূর্বের স্থানীয় প্রশাসন একতরফাভাবে বিতর্কিত সাবেক কমিটিকে নানা সুবিধা দিয়ে এসেছে। আমিসহ আমার কমিটির অনেকের বিরুদ্ধে সঞ্জয় কর্মকার ষড়যন্ত্রমূলক একাধিক মামলা দিয়ে আমাদের হয়রানি করে আসছে।’
ফকির চাঁদ বৈষ্ণব গোঁসাইয়ের প্রধান সেবাইত চিমন্ত চন্দ্র রায় পরমানন্দ সাধু জানান, ‘অনিয়মের বিষয়টি সঠিক নয়। আমরা সাবেক কমিটি দিয়ে আশ্রম ভালোভাবেই পরিচালনা করেছি।’ আশ্রম পরিচালনা কমিটির সাবেক সভাপতি সঞ্জয় কর্মকার জানান, টাকা আত্মসাতের বিষয়টি ভিত্তিহীন, বানোয়াট। এ বিষয়ে মামলা চলমান আছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জুুলহাস হোসেন সৌরভ বলেন, আশ্রমকেন্দ্রিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিকল্পে দুপক্ষকেই অনুরোধ করা হয়েছে। সাবেক কমিটির সভাপতির বিরুদ্ধে দেড় কোটি টাকা আত্মসাৎ মামলার বিষয়ে আমি অবগত নই।’ ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, সঠিক সময়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
