ঔষধি গ্রামে ঘৃতকাঞ্চন চাষে সফলতা


উদ্যোগ সদর

নিজস্ব প্রতিবেদক

(৩ বছর আগে) ৭ মার্চ ২০২৩, মঙ্গলবার, ৫:৫৭ অপরাহ্ন

natoreview

নাটোর সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর খোলাবাড়িয়া ইউনিয়নে রয়েছে ১৬টি গ্রাম। ১০০ জাতের ভেষজ উদ্ভিদ চাষের এই গ্রামগুলো ‘ঔষধি গ্রাম’ নামে পরিচিতি। গ্রামগুলোয় ঘৃতকাঞ্চন চাষে ব্যাপক সফলতা এসেছে।

নাটোর জেলার কৃষি খাতে রয়েছে বৈচিত্র্য। তবে নাটোর শহর থেকে সাত কিলোমিটার দূরে লক্ষ্মীপুর খোলাবাড়িয়া ইউনিয়নের এসব গ্রামে পরিমাণে সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত ভেষজ উদ্ভিদের নাম ঘৃতকাঞ্চন বা এলোভেরা। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে উৎপাদিত এলোভেরা বিক্রি হয় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

এই ইউনিয়নের ১৬টি গ্রামের ১২টিতে আংশিক ও চারটিতে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ হয় ঘৃতকাঞ্চন বা এলোভেরা। তবে শুরুটা সহজ ছিল না। ১৯৯৫ সালে আফাজ উদ্দীন নামে এক ব্যক্তি প্রথম এই গ্রামে ঘৃতকাঞ্চন গাছের চারা এনে রোপণ করেন। চার মাস পর ঘৃতকাঞ্চন পাতা গজানো শুরু হলে তিনি বাজারে বিক্রি শুরু করেন। শহর থেকে তখন শরবত বিক্রেতারা ঘৃতকাঞ্চন পাতা কিনে নিয়ে যেতেন। বিষয়টি লক্ষ করেন ওই এলাকার কয়েকজন মাদকসেবী। আফাজের দেখাদেখি তারা প্রথমে স্বল্প পরিসরে শুরু করেন ঘৃতকাঞ্চন চাষ। পাতা গজালে তারাও বিক্রি শুরু করেন। এভাবে ঘৃতকাঞ্চন বিক্রির টাকা দিয়ে তারা নেশা করতেন। অল্প অল্প করে কৃষিজমিতে ঘৃতকাঞ্চনের আবাদ হতে হতে দ্রুতবর্ধনশীল এই গাছের চারা রোপণ শুরু করেন অন্যরাও। এভাবেই গ্রামটিতে শুরু হয় ঘৃতকাঞ্চন চাষ।

ঘৃতকাঞ্চন চাষে সফলতার পর গ্রামবাসীরা একের পর এক বিভিন্ন জাতের ঔষধি গাছ লাগাতে শুরু করলে এখানে ঘটে ভেষজ বিপ্লব, নাম হয়ে যায় ঔষধি ইউনিয়ন।

ঘৃতকাঞ্চন চাষিরা জানান, একটি ঘৃতকাঞ্চন চারাগাছের দাম ৩০ টাকা। এক বিঘা জমিতে ১২ হাজার গাছ লাগানো যায়। বিঘাপ্রতি ৫০ কেজি করে টিএসপি ও পটাশ সার প্রয়োগ করে ঘৃতকাঞ্চন জমি প্রস্তুত করতে হয়। জমিতে চারা রোপণের তিন মাস পর থেকেই তোলা যায় ঘৃতকাঞ্চন পাতা। প্রতি সপ্তাহে একবার করে মাসে চারবার একটি গাছ থেকে পাতা সংগ্রহ করা যায়। তিনটি ঘৃতকাঞ্চন পাতার ওজন এক কেজি। চাহিদা বেশি হওয়ায় গ্রীষ্মকালে কেজিপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টাকা এবং বছরের অন্য সময়ে ১০ টাকা কেজিদরে বিক্রি হয় এলোভেরা।

ঘৃতকাঞ্চন ব্যবসায়ীরা জানান, বছরের চৈত্র-বৈশাখ মাসে প্রতিদিন ৩০ টন ঘৃতকাঞ্চন ঢাকায় যায় এখান থেকে। এছাড়া বছরের অন্য সময় প্রতিদিন ঘৃতকাঞ্চনের চাহিদা থাকে ১২ থেকে ১৫ টন।

ঘৃতকাঞ্চনচাষি রফিকুল ইসলাম জানান, এ বছর তিনি এক একর জমিতে ঘৃতকাঞ্চন চাষ করেছেন। তবে পানি অসহিষ্ণু হওয়ায় সেপ্টেম্বর মাসে অকালবর্ষণে নষ্ট হয়েছে ক্ষেত।

অরেক চাষি শাসমুজ্জামান জানান, নিজস্ব দুই বিঘা জমিতে তিনি ঘৃতকাঞ্চন আবাদ করেছেন এবং প্রতি সপ্তাহে ৩৫০ কেজি ঘৃতকাঞ্চন ঢাকায় বিক্রি করেন তিনি।

বনলতা ভেষজ ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী কবির আহমেদ জানান, তিনি নিজের তিন বিঘা জমিতে ঘৃতকাঞ্চন চাষ করেছেন। সপ্তাহান্তে ঘৃতকাঞ্চন তুলে রাজধানীর কারওয়ান বাজার ও গাজীপুরের টঙ্গীর পাইকারদের কাছে তিনি বিক্রি করেন।

খোলাবাড়িয়া ঔষধি গ্রাম উন্নয়ন সমিতির সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, ভেষজ উদ্ভিদের চাষাবাদ আমাদের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। আমরা আরও বিস্তৃত চাষাবাদের সুযোগ চাই। কৃষিমন্ত্রী গ্রামগুলো পরিদর্শন করে আমাদের জন্য একটি বাজারের ব্যবস্থা করে দিলে ন্যায্য দাম পেতে পারি।

খ্রিষ্টপূর্ব যুগ থেকেই ভেষজ চিকিৎসা শাস্ত্রে ঘৃতকাঞ্চনের ব্যবহার দেখা যায়। পাতার রস যকৃৎ ও শাঁস ফোঁড়ার জন্য উপকারী। হাঁপানি ও অ্যালার্জি প্রতিরোধে ঘৃতকুমারী বৈজ্ঞানিকভাবেই কার্যকর।

ভেষজ গবেষক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক উজ্জ্বল হক বলেন, উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোয় ৮০ শতাংশ মানুষের চিকিৎসাসেবায় ভেষজ উদ্ভিদ সাশ্রয়ী ও উপযুক্ত হতে পারে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ামুক্ত ভেষজ চিকিৎসার কাঁচামাল উৎপাদনে সহায়ক হওয়ায় আগামী দিনে লক্ষ্মীপুর খোলাবাড়িয়া ইউনিয়ন থেকেই উšে§াচিত হবে বিজ্ঞাননির্ভর প্রাকৃতিক ওষুধ উৎপাদনের নতুন দিগন্ত।

শেয়ার বিজের সংবাদ।

উদ্যোগ থেকে আরও পড়ুন

সর্বশেষ