ইকবাল হোসেন। কমিশন ভিত্তিতে বেকারি পণ্য বিক্রি করেন। ভোরে বাড়ি থেকে বের হয়ে বাইসাইকেলযোগে বেকারিতে যান। সেখান থেকে ব্যাগে ও প্লাস্টিকের ক্যারেটে করে বেকারির বিভিন্ন পণ্য নিয়ে দোকানে দোকানে বিক্রি করনে। পাঁচজনের সংসার চলে তার এই রোজগার দিয়েই। সম্প্রতি বিক্রি কমায় তার আয়ও কমেছে কিন্তু বেড়েছে সংসার খরচ। চলতি মাসের ৬ তারিখ থেকে ডিজেল, পেট্রল ও অকটেনের দাম বাড়ার প্রভাবে সংকটে নিম্ন আয়ের ইকবাল হোসেন।
তিনি বলছেন, গত কয়েক মাস ধরেই বেকারি পণ্যের দাম বেড়েছে। কোন কোন পণ্যের দাম দ্বিগুণ হওয়ায় বিক্রিও কমেছে। আয় কমলেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর বাজারে সবকিছুর দামই উর্ধমুখি। সংসার ব্যয় সামলতে গিয়ে প্রতিদিন যে পরিমাণ গরুর দুধ নিতাম তা বন্ধ করে দিতে হয়েছে।
কাপড়ের দোকানের কর্মচারি আজিজুর রহমান, কসমেটিকস দোকানের সুমন মিয়া, ঢেউটিনের ঘর বাঁধার কাজ করেন আব্দুল গফুর, হোটেল শ্রমিক রফিকুল ইসলাম কিংবা সাইকেল মেকার জহুরুল মিয়া। নিম্নবিত্তের অনেকের গল্প এখন একই রকম। সবাই বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর প্রতিদিনের খরচে তাদের অনেক বদল আনতে হয়েছে। পরিবর্তন আনতে হচ্ছে প্রতিদিনকার খাদ্য তালিকায়।
আব্দুল গফুর বলছেন, প্রতিদিন কাজ করে যে টাকা পাই দিন শেষে বাজার খরচ করার পর হাতে আর কিছুই থাকে না। বাড়িতে থাকা ছোট দুই মেয়ের জন্য আর কোন ‘সদাই’ নিয়ে যেতে পারি না। তাদের মুখের দিকে তাকালে খারাপ লাগে।
সাইকেল মেকার জহুরুল মিয়া বলছেন, আয় বাড়েনি কিন্তু নিত্যপণ্যের দাম এতটাই বেড়েছে যে, সংসর খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই এখন মাছ-মাংস কেনা কমিয়ে দিয়েছি। ডাল, ভর্তা দিয়ে দু’বেলার খাবার খেতে হচ্ছে।
রেজাউল করিম একটি কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি। তিনি বলছেন, বাজারে সব ধরনের সবজি, মনোহারি পণ্যসহ সবকিছুর দাম বেড়েছে, কিন্তুআয় বাড়েনি। ফলে বর্তমান আয় দিয়ে বাজার-সদাই করে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সাইদুর রহমানও বলছেন, গত কয়েক মাসে কারণে-অকারণে প্রয়োজনীয় সব কিছুর দাম বেড়েছে, কিন্তু রোজগার বাড়েনি। সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর নানামুখি সংকটের মধ্যে দিয়ে দিন পার করতে হচ্ছে। ছেলের প্রাইভেট টিচার বলেছেন টাকা বাড়াতে, বেড়েছে রিকশা ভাড়া তাই বর্তমান আয় দিয়ে আর চলছে না। বর্তমান আয়ে ব্যয় না মেটাতে পেরে হয়তো ছেলের প্রাইভেটই বন্ধ করে দিতে হবে।
নিম্ন ও মধ্যবিত্তরে অনেক সীমিত আয়ের মানুষই এখন প্রতিদিনের নানা খাতে ব্যয় কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছেন। মাছ, মাংস ডিম ও দুধ কেনার ব্যয় কমিয়েছেন অনেকেই। কেউ কেউ স্বল্প দূরত্বের পথে রিকশার বদলে হেঁটে চলাচল শুরু করেছেন। পরিবার নিয়ে বাইরে খাওয়া, ঘুরতে যাওয়া, বিকেলে হালকা খাবার বন্ধ করেছেন অনেক পরিবার।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাল, ডাল, তেল, লবণের পাশাপাশি যাতায়াত, পোশাক, খাতা-কলম, চিকিৎসাসেবাসহ নানা ধরনের খাদ্যবহির্ভূত পণ্য ও সেবার দাম বেড়েছে। আয় না বাড়লে খাবারসহ ভোগ কমিয়ে সংসারের বাজেট মেলাতে হচ্ছে নিম্ন ও মধ্যবিত্তদের। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি জীবনযাত্রার পদে পদে খরচ বাড়ায় আয়ের সঙ্গে সংগতিহীন, লাগামহীন খরচে দারিদ্র্যসীমার কিছুটা ওপরে থাকা লাখ লাখ পরিবারকে আবারও গরিব হওয়ার ঝুঁকিতে ফেলেছে।
দারিদ্র্য নিয়ে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় গরিব হওয়ার ঝুঁকিতে আছে প্রায় ৫৫ শতাংশ মানুষ। অর্থনীতিতে আকস্মিক চাপ বা নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় দারিদ্র্যসীমার একটু ওপরে থাকা পরিবারগুলো আবার গরিব হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিবিএস’র জনশুমারি অনুযায়ি, বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৫১ লাখ। সেই হিসাবে, ৯ কোটির বেশি মানুষ যেকোন সময় এমন ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে জিনিসপত্রের দাম বাড়লে তা ধনীদের জন্য শুধু বিরক্তির ব্যাপার। কিন্তু গরিব ও সীমিত আয়ের মানুষের কাছে তা জীবিকার সংকট। এবারের জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের বেশি কষ্ট হচ্ছে। কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যসহ সব খাতেই খরচ বেড়েছে। মূল্যস্ফীতির তথ্যে এর প্রভাব না আসলেও মানুষ বাজারে গিয়ে ঠিকই টের পাচ্ছে। কারণ, বাজারের জিনিসপত্রের মূল্য বৃদ্ধির তথ্য লুকিয়ে রাখা যাচ্ছে না।
