আচরণে, চলাফেলায় দারুণ শান্ত। কথাবার্তায়ও মিতভাষী। মৃদুভাষীও বটে। কথা বলেন অনেক ভেবেচিন্তে। ক্রিকেট খেলতে খেলতে মাথাটা যে পাকিয়ে ফেলেছেন, সেটা বেশ বোঝা যায় তাইজুল ইসলামের কথা শুনলে। মাত্র ২২ বছর বয়সেই বেশ পরিণত তার কথার ধরন। শুনুন তার প্রশ্নোত্তর...
সব মা-বাবাই তো সন্তানের জন্য হৃদয়ের ও সাধ্যের সবটুকু নিংড়ে দেন। নাটোরের এসকান্দার আলী ও তাসলিমা বেগমও দিয়েছিলেন। অভাবের সংসার, নুন আনতে পানতা ফুরোয়। তবু ছেলেকে কখনও কষ্ট করতে দেননি। ছেলের স্বপ্নটা আকাশছোঁয়া হলেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে বলেননি_ আমরা তো 'বামন'! বরং সেই স্বপ্নকে ওপর থেকে ছায়া দিয়ে গেছেন দিনের পর দিন। এই দম্পতির কষ্ট সার্থক হয়েছে। তাদের ছেলে 'রাঙা'ই যে আজকের তাইজুল! নাটোরের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে জাতীয় দলে খেলছেন তাদের দুই মেয়ের পরে হওয়া ছেলেটি। তাইজুল ইসলাম কাউকে হতাশ করেননি। বরং টেস্টে বাংলাদেশের সেরা পারফরম্যান্স ও ওয়ানডে ইতিহাসের প্রথম বোলার হিসেবে অভিষেকেই হ্যাটট্রিক করে নিজেকে, পরিবারকে, দলকে, দেশকে গৌরবদীপ্ত করেছেন। জাতীয় দলে আসার আগে ঘরোয়া মঞ্চে ছিলেন দারুণ ধারাবাহিক। সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রবেশের আগে এমন ঘরোয়া রেকর্ড বাংলাদেশের খুব কম ক্রিকেটারেরই আছে। অথচ রতনে রতন না চিনলে হয়তো তার এতদূর আসাই হয় না! হ্যাঁ, 'নাটোরের রাঙা' এতদূরই এসেছেন। মাত্র এক ম্যাচের ক্যারিশমায় খেলতে যাচ্ছেন স্বপ্নের বিশ্বকাপও! তার সেই উঠে আসার সংগ্রামী গল্প মানুষের অদম্য বিজয়-কাহিনীকে আরও মহিমান্বিত করবে। তাইজুলের মুখে সেই বেদনাবিধুর অথচ প্রেরণাদীপ্ত গল্পটাই শুনলেন সৌমিত জয়দ্বীপ
আমার বাবা খুব বড় ব্যবসা করতেন না। পুরনো কাপড়ের ছোটখাটো ব্যবসা ছিল তার। হাটে হাটে সেই কাপড় বিক্রি করতেন। কখনও কখনও আমি যেতাম। এমন এক ব্যবসা দিয়ে পাঁচজনের সংসার চালানো খুব কঠিন ছিল। তবুও, আমার খেলার জন্য যা দরকার তা তিনি করেছেন। সরঞ্জাম কিনতেও তো কম টাকা লাগে না। সেই টাকাটাও বাবা জোগাড় করেছেন।
নবম-দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় রাজশাহীতে অনূর্ধ্ব-১৫-র হয়ে অনুশীলন করতে যেতাম বিভাগীয় কোচ শানু স্যারের কাছে। রাজশাহী যাওয়ার জন্য সে সময় প্রতিদিন ৫০-৬০ টাকা করে খরচ হতো। বাবা অনেক কষ্ট করে টাকাটা জোগাড় করে আমাকে পাঠাতেন। এমনও দিন গেছে, হয়তো আমাদের বাড়িতে খাবার জোটেনি; কিন্তু বাবা ঠিকই যাতায়াতের টাকাটা হাতে তুলে দিয়েছেন।
এই টাকা আর অভাব-অনটনের কথা বললে আমি কোনোদিনই একটা স্মৃতি ভুলব না। আমাদের এলাকায় একটা খেলায় ব্যাটিং-বোলিংয়ে ভালো পারফরম্যান্স করে আমাদের দলকে জিতিয়েছিলাম। খুব ছোট ছিলাম তখন। ভালো খেলার জন্য এক ভাইয়া খুশি হয়ে আমাকে দশ টাকা পুরস্কার দিয়েছিলেন। আমার জীবনে খেলার জন্য পাওয়া প্রথম পুরস্কার! আমি তো ভীষণ আনন্দ নিয়ে বাড়িতে গেলাম। বাড়ি গিয়ে শুনি, চাল ছাড়া রান্নার আর কোনো তরকারি নেই। বাবাকে তখন পুরো ঘটনা বললাম। বাবা ডাল আনতে বললেন। ডাল আনলাম। রান্না হলো। কোনোমতে চলে গেল! সেই দিনটার কথা খুব মনে পড়ে!
আমার মায়ের সবচেয়ে বড় বোন (আকলি খালা) আমাকে খুব আদর করেন। তিনি আমাকে ডাকেন রাঙা নামে। গ্রামে নানা-দাদার বাড়িতেও সবাই আমাকে এই নামেই চেনেন। যদিও বাবা-মা আমাকে তাইজুল বলেই ডাকেন। আমাদের পরিবার নাটোর শহরে থাকলেও, গ্রামের বাড়ি শহর থেকে ছয়-সাত কিলোমিটার দূরে। খালাও ওখানেই থাকেন। খালার কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ। এমনও সময় গেছে, খালা কানের দুল বিক্রি করে আমাকে ব্যাট কিনে দিয়েছেন। নাটোরে গেলেই আমি খালার কাছে যাই। আমার দুই বড় বোন। দুলাভাইয়েরাও যথাসাধ্য সহযোগিতা করেছেন আমাকে।
এই কথাগুলোই বলে দিচ্ছে, আমি অনেক গরিব পরিবার থেকে উঠে এসেছি। দুঃখকষ্টের মধ্যে বড় হয়েছি। এমন একটা সময় গেছে, যখন টাকার অভাবে পড়ালেখাটা পর্যন্ত করতে পারিনি। দশম শ্রেণীতে এসে তো পড়ালেখা ছেড়েই দিলাম! পরে প্রিমিয়ার লীগে খেলার সময় উন্মুক্ত থেকে এসএসসিতে পাস করি। এখন উন্মুক্ত থেকে কলেজ পর্যায়ে পড়ি। আমার পেছনে খরচ করতে গিয়ে আমার বাবা-মাকে ঋণও করতে হয়েছে। প্রথম বিভাগে খেলার সময়ই আমি অবশ্য সব ঋণ শোধ করে দিয়েছি। আমিও ছোটবেলা থেকেই কষ্ট করেছি। কিন্তু ক্রিকেটার হওয়ার যে স্বপ্ন, সে স্বপ্ন থেকে পিছু হটিনি।
ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেট খেলতে পছন্দ করতাম। খেলা দেখতে পছন্দ করতাম। তো নাটোরে একদিন মাইকিং করা হচ্ছিল_ অনূর্ধ্ব-১৩ বয়সের ক্রিকেটারদের বাছাই অনুষ্ঠিত হবে। এটা শোনার পর আমার আলাউদ্দিন চাচা বাড়িতে এসে বললেন, যেতে চাই কি-না? খেলতে পছন্দ করতাম। না যাওয়ার তো প্রশ্নই আসে না! ওই সময়টায় আমি ব্যাট ধরতাম উল্টো করে। মানে বাঁহাতি ব্যাটসম্যান হিসেবে ডান হাতটা ওপরে থাকার কথা থাকলেও ওটা থাকত নিচে, বাঁ হাতটা থাকত ওপরে! ক্রিকেটবলে খেলা শুরু করার পর এ অভ্যাসটা পরিবর্তন হয়। তবে, ওই বাছাইয়ে যাওয়ার পর বাদ পড়ে গেলাম!
সে সময় নাটোর অনূর্ধ্ব-১৭ দলে খেলতেন আমার এক চাচা, মাসুম চাচা। তিনি বললেন, ওকে বাদ দিয়েন না। হয়তো ভবিষ্যতে ভালো খেলবে। আমি পেস বোলিং আর ব্যাট করলাম। তখন অনেক ছোট। দেখা যেত যে, কিপিং প্যাড পরে ব্যাটিং করার পরও প্যাডটা বড় হয়ে যেত! ক্রিকেট বলে খেলা সেই শুরু।
সুুযোগ পাওয়ার পর নাটোরের আলাইপুর স্পোর্টিং ক্লাবে অনুশীলন শুরু করলাম। সেই ক্লাবের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন মঞ্জু চাচা। কোচ ছিলেন মতিন খান চৌধুরী পেয়ারা। তো মঞ্জু চাচা আমার পেস বোলিং দেখে একদিন বললেন, 'তুই এত ছোট একটা ছেলে, পেস বোলিং করিস কেন? স্পিন বল করবি।' অনূর্ধ্ব-১৩ খেললাম। এটা ২০০৪ কি ২০০৫ সালের দিককার ঘটনা। বিভাগীয় দলেও সুযোগ পেলাম। তবে, সেরা চৌদ্দজনের স্কোয়াডে আসতে পারিনি সেবার।
এরপর অনূর্ধ্ব-১৫ খেললাম। জেলা থেকে বিভাগীয় দলেও সুযোগ পেলাম। জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে নাটোর থেকে আমিই প্রথম সুযোগ পেলাম রাজশাহী বিভাগীয় দলে। বিভাগীয় দলের হয়ে গেলাম ফরিদপুরে খেলতে। মজার বিষয় হলো, তখন ডাক পেয়েছিলাম উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান হিসেবে! সেখান থেকে ডাক পেয়ে গেলাম জাতীয় প্রশিক্ষণ শিবিরেও (ন্যাশনাল ক্যাম্প)। ক্যাম্প থেকে অবশ্য সেরা ১৫ জনের মধ্যে আসতে পারিনি।
এরপর অনূর্ধ্ব-১৮ খেললাম। প্রথমবার খেললাম; কিছু করতে পারিনি। পরেরবার খেলার পর অনূর্ধ্ব-১৯-এর জন্য একটা ৪২ জনের স্কোয়াড হয়েছিল। সেই স্কোয়াডে আমি, সৌরভ (মুমিনুল হক), রুম্মন (সাবি্বর রহমান) ডাক পেলাম। এরপর ওই স্কোয়াড থেকেই শ্রীলংকা অনূর্ধ্ব-১৯ দলের বিপক্ষে বাংলাদেশ-১৯ দলের হোম সিরিজে সুযোগ পেলাম। আমাদের ব্যাচে আমি ওই একটা সিরিজই খেলেছি। তারপর বাদ পড়ে যাই। এটা ২০০৯-১০ সালের কথা।
এই সময়ের মধ্যেই আমি দু'বার ঢাকার দ্বিতীয় বিভাগের লীগ খেললাম। পরের দু'বার খেললাম প্রথম বিভাগ লীগে ওরিয়েন্টের হয়ে। এই সময়টা বিসিবির জুয়েল স্যার আমাকে প্রচুর সাহায্য ও পরামর্শ দিয়েছেন। এরপর এলাম ধানমণ্ডি ক্লাবে, যেটা নাম পরিবর্তন করে হয়ে গেল শেখ জামাল। ওই বছরই শেখ জামাল প্রিমিয়ার ডিভিশনে উঠে গেল। প্রথমবার প্রিমিয়ার খেলেই অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেলাম আমরা! সেই দলের কোচ ছিলেন সুজন ভাই (খালেদ মাহমুদ)। তিনি আমাকে প্রচুর সাহায্য করেছেন। আজও করেন। এমনকি অর্থনৈতিকভাবেও এখনও সাহায্য করেন প্রয়োজনে। তার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। প্রিমিয়ার থেকে প্রথম বিপিএলের শেষ দিকে সুযোগ পেলাম দুরন্ত রাজশাহীতে। এজন্য আমি পাইলট (খালেদ মাসুদ) ভাইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞ। জাতীয় লীগে রাজশাহীর বিভাগীয় দলে বিবেচনা করায় কোচ সাদ ভাইয়ের প্রতিও আমার কৃতজ্ঞতা। বিপিএলের পর আমাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। সবার সহযোগিতা ও পরামর্শে আমি আজ এখানে। বিশ্বকাপেও খেলতে যাচ্ছি। ব্যাপারটা কেমন স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে!
অনেকেই অল্পতে হাল ছেড়ে দেয়। আমি ছাড়িনি। আমার খুব ভালো লাগে যে, আমি নাটোরের মুখ উজ্জ্বল করতে পেরেছি। আমার গর্ব এটাই যে, আমি আমার মা-বাবার কষ্ট সার্থক করতে পেরেছি। যতদিন পারি, আমি দেশের হয়ে খেলে যেতে চাই। আর বিশ্বকাপে তো চাই-ই স্মরণীয় একটা কিছু করে দেশকে রাঙিয়ে দিতে!
